ভোরের অদ্ভুত এক সকাল
সোমবার সকাল আটটা। সাধারণত এই সময়ে আমি নাশতা করি এবং সম্পাদকদের কাছে কোন গল্পের প্রস্তাব পাঠাব তা ভাবি। কিন্তু আজকের সকালটি ভিন্ন।
ভোরের আলো ফুটতেই আমি উপস্থিত হয়েছি থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই শহরে পিং নদীর তীরে অবস্থিত একটি নতুন বাড়িতে। সেখানে আমার দুই বন্ধু—ইয়ান হোয়াইট ও সোফা লিলিদপিকর্ন—তাদের নতুন বাড়ির জন্য একটি স্পিরিট হাউস স্থাপনের অনুষ্ঠান করছেন।
ইংরেজ-থাই এই দম্পতির বাড়ির জন্য নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠানের সময়, স্থান এবং স্পিরিট হাউসের দিকনির্দেশ সবই ঠিক করেছেন একজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত, যার নাম পর সাওয়ান। তিনি একটি পিকআপ গাড়িতে করে সহকারীদের নিয়ে উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিল অনুষ্ঠানের সব উপকরণ।
বৌদ্ধ দেশের ভেতরে প্রাচীন বিশ্বাস
থাইল্যান্ডে প্রায় সর্বত্রই স্পিরিট হাউস দেখা যায়। তবে প্রথমবারের দর্শনার্থীদের কাছে এটি কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কারণ দেশটির প্রধান ধর্ম বৌদ্ধধর্ম।

এর কারণ হলো থাইল্যান্ডে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি বহু পুরনো লোকবিশ্বাসও টিকে আছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় সহনশীলতার মধ্যেই এসব বিশ্বাসের স্থান রয়েছে। এমনকি অনেক বৌদ্ধ মন্দিরের প্রাঙ্গণেও এই ধরনের ছোট্ট পূজাস্থল দেখা যায়।
শুধু স্পিরিট হাউসই নয়, থাইল্যান্ডে আরও অনেক আচার রয়েছে যা বৌদ্ধধর্মের বাইরের প্রাচীন বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। নতুন রাজাকে সিংহাসনে বসানোর অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের মাধ্যমে বিশেষ পূজার আচার সম্পন্ন করা হয়। আবার প্রতি বছর ধান চাষের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে যে রাজকীয় হালচাষ অনুষ্ঠান হয়, তাতেও ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ উভয় আচার একসঙ্গে পালিত হয়।
ভূমির আত্মার জন্য একটি ঘর
থাই সমাজে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে—যে জমিতে বাড়ি তৈরি হয়, সেই জমির আত্মার জন্য আলাদা একটি ঘর তৈরি করলে সেই আত্মা নতুন বাসিন্দাদের রক্ষা করে। বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়।
এছাড়া জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ—পরীক্ষা, কাজ কিংবা ভালোবাসা—মোকাবিলায়ও এই আত্মা সহায়তা করে বলে বিশ্বাস করা হয়, যদি তাকে নিয়মিত উৎসর্গ বা নিবেদন করা হয়।
থাই ভাষায় এই ভূমির আত্মাকে বলা হয় ‘ফ্রা ফুম’। আর যেই ছোট্ট মন্দিরে সেই আত্মা বসবাস করে, তাকে বলা হয় ‘সান’। তাই স্পিরিট হাউসকে বলা হয় ‘সান ফ্রা ফুম’।

নদীর তীরে এক শান্ত বাড়ি
আমরা যখন দম্পতির নতুন বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম, তখন বাড়িটি দেখে মনে হচ্ছিল যেন ইংরেজি ধাঁচের ছোট্ট একটি কটেজ। চারপাশে পরিপাটি বাগান আর বিশাল গাছপালা। প্রথমে মনে হলো এমন শান্ত জায়গায় হয়তো বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু নদীর ধারে পৌঁছে ভিন্ন দৃশ্য দেখা গেল। সাম্প্রতিক বন্যায় নদীর অপর পাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে গেছে। সেখানে একটি বিশাল রেইন গাছের শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এবং গাছটি যেন পাশের ভবনের ওপর পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
তখন মনে হলো—প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখন এসে হাজির হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে যদি একটি শক্তিশালী ও সদয় আত্মার সুরক্ষা পাওয়া যায়, তা মন্দ নয়।
অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি
নদীর ধারে একটি সিমেন্টের আয়তাকার জায়গা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে স্পিরিট হাউসটি স্থাপন করা হবে। পুরোহিতের সহকারীরা দ্রুত কাজ শুরু করলেন।
টেবিল সাজানো হলো ‘বাই শ্রী’ নামের শঙ্কু আকৃতির নিবেদন দিয়ে। এগুলো তৈরি হয় কলাপাতা, জুঁই ও গাঁদা ফুল দিয়ে। পাশাপাশি কলাগাছের কাণ্ড দিয়ে বানানো পাত্রে রাখা হলো নানা ফল, যা ভূমির আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য উৎসর্গ করা হবে।
সবকিছুই ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি। কোথাও প্লাস্টিকের ব্যবহার দেখা যায়নি। ফলে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিবেশবান্ধব বলেই মনে হয়েছে।

প্রাচীন আচার, আধুনিক প্রযুক্তি
পুরোহিত পর সাওয়ান ঐতিহ্যবাহী সাদা পোশাক পরে এসেছিলেন। তবে তার সঙ্গে ছিল একটি ছোট মাইক্রোফোন ও অ্যাম্প্লিফায়ার। এর সাহায্যে তিনি মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন।
তার হাতে ছিল পিতলের তৈরি একটি ছোট মূর্তি—ভূমির আত্মা ফ্রা ফুমের প্রতীক। মূর্তির হাতে একটি তলোয়ার এবং অর্থের থলে রয়েছে, যা শক্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
পুরোহিত মূর্তিটি জুঁই ফুলের মালার ওপর রেখে তার উপরে সুতোয় বাঁধা একটি ছোট বল ঘুরাতে লাগলেন। পরে জানা গেল, এটি আত্মাকে নতুন বাসস্থান গ্রহণে রাজি করানোর গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
স্পিরিট হাউস স্থাপন
মন্ত্রপাঠের পর ইয়ান হোয়াইট সিমেন্টের ভিত্তির একটি ছোট খোপে ফুল ও কয়েনের নিবেদন রাখলেন। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সহকারীরা স্পিরিট হাউসের খুঁটি, মঞ্চ ও ছোট্ট ঘরটি স্থাপন করে ফেললেন।
নিচে রাখা হলো আরেকটি ছোট মঞ্চ, যেখানে ফল, ফুল ও ধূপ উৎসর্গ করা হবে।
মঞ্চে রাখা হলো ছোট ছোট নৃত্যশিল্পী, গৃহপরিচারক ও পশুর মডেল। সবশেষে হোয়াইট ভূমির আত্মার মূর্তিটি স্পিরিট হাউসের ভেতরে স্থাপন করলেন।
শেষ আশীর্বাদ
এরপর আবার মন্ত্রপাঠ শুরু হলো। পুরোহিত স্পিরিট হাউসের পাশে সুতোয় বাঁধা বল ঘুরিয়ে আত্মাকে অনুরোধ করলেন নতুন বাসিন্দাদের রক্ষা করতে।

তারপর একটি ঘণ্টা বাজিয়ে নারকেল পাতার ঝাড় দিয়ে উপস্থিত সবাইকে এবং স্পিরিট হাউসটিকে পবিত্র জল ছিটিয়ে আশীর্বাদ করলেন।
হঠাৎ করেই মন্ত্রপাঠ থেমে গেল এবং অনুষ্ঠান শেষ হলো।
নতুন শুরুর আনন্দ
বিদায় নেওয়ার আগে পুরোহিত বাড়ির ভেতর ঘুরে দেখলেন এবং বিভিন্ন আসবাব ও অলঙ্কারের ওপর পবিত্র জল ছিটিয়ে আশীর্বাদ করলেন।
তারপর আমরা নদীর ধারের একটি প্যাভিলিয়নে বসে কফি ও কেক খেলাম।
ইয়ান হোয়াইট সন্তুষ্টির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি বললেন, “ভূমির আত্মার জন্য একটি ঘর তৈরি করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। আমরা নিয়মিত নিবেদন করব। এতে মানুষের জগত আর আত্মার জগতের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হবে।”
শেষ পর্যন্ত পেট ভরে খাওয়া আর নতুন একটি গল্পের ধারণা নিয়ে আমি বাড়ির পথে রওনা হলাম—ভূমির আত্মার নতুন ঘর নিয়ে একটি লেখা লেখার ভাবনা মাথায় নিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















