ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সোমবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় পতন
এদিন এশিয়ার বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। দেশের দুই বড় প্রযুক্তি কোম্পানি স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারও প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক নিক্কেই স্টক অ্যাভারেজ এক পর্যায়ে ৪,২০০ পয়েন্ট বা প্রায় ৭.৬ শতাংশ পড়ে গিয়ে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে। একই সময়ে বৃহত্তর টপিক্স সূচকও প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে
শেয়ারবাজারে এই বড় পতনের পেছনে মূল কারণ তেলের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে। এর ফিউচার মূল্য ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
সংঘাত বাড়ায় জ্বালানি সরবরাহে শঙ্কা
ইরানকে ঘিরে সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। খবর পাওয়া গেছে, ইরান ও বাহরাইনের গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি পরিস্থিতির বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত।
এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং তেল ও গ্যাস উৎপাদনও বিঘ্নিত হতে পারে, যার ওপর বিশ্বের অনেক দেশ নির্ভরশীল।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
বর্তমানে পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরান হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ট্যাংকারে হামলা চালাতে পারে। এই প্রণালীটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ।
তেল ও ট্যাংকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের পরিচালক আন্দন পাভলভ এক প্রতিবেদনে বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তা আধুনিক ইতিহাসে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের একটি হবে। কারণ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়।
তিনি আরও জানান, এতে এশিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত।

জাপানের শিল্পখাতে চাপ
জাপান তার মোট তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। দেশটির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব।
টোকিও শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি, খুচরা বিক্রেতা, জ্বালানি ও শিল্পখাতসহ প্রায় সব খাতের শেয়ারই কমেছে।
জ্বালানি কোম্পানি ইদেমিৎসু কোসানের শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক অংশীদারদের জানিয়েছে, যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকে এবং কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তারা দেশে ইথিলিন উৎপাদন বন্ধ করতে পারে।
ইথিলিন ছাড়া প্লাস্টিক উৎপাদন সম্ভব নয়। ফলে গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির শিল্পেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বাজারে বড় সংশোধনের আশঙ্কা
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, জাপানের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংশোধন দেখা দিতে পারে।
তাদের মতে, ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে জাপানের বাজারে উল্লেখযোগ্য কোনো পতন হয়নি, যা ঐতিহাসিকভাবে অস্বাভাবিক। তবে গত সপ্তাহে সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা চলতে পারে।
ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনেও উদ্বেগ
ইরানকে ঘিরে সংঘাত বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।
মোজতবা খামেনি ইরানের কঠোরপন্থী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত। এই পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও চাপ
শুধু জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও বড় চাপ দেখা গেছে।
তাইওয়ানের শেয়ার সূচক প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। ফিলিপাইনের বাজারও একই মাত্রায় নেমে গেছে। অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডের শেয়ার সূচক ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
সিঙ্গাপুরের বাজার ও হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচকও প্রায় ৩ শতাংশ করে কমেছে।
মুদ্রাবাজারেও চাপ
ডলারের বিপরীতে এশিয়ার অনেক মুদ্রাও দুর্বল হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।
জাপানি ইয়েন প্রায় ০.৭ শতাংশ কমে ডলারপ্রতি ১৫৮ ইয়েনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিশ্ববাজারে ঝুঁকিভীতি
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি গ্লোবাল মার্কেটস রিসার্চের মুদ্রা বিশ্লেষক লয়েড চ্যান বলেন, বিশ্ববাজার এখন স্পষ্টভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে চলার অবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, এশিয়ার যেসব দেশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মুদ্রা ও শেয়ারবাজারে আরও চাপ পড়তে পারে।
বিশেষ করে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন তেলের দামের ধাক্কা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















