মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে তেলের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি চীনের জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ—সবকিছুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের দাম বৃদ্ধি ও জ্বালানি ঝুঁকি
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর পেছনে বড় কারণ হচ্ছে ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা।
চীনের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি সমুদ্রপথে যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তার অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর একটি বড় অংশ ইরান থেকে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন ইরানি তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা।
যদি ইরান থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে চীনকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। কিন্তু সেই তেল হবে অনেক বেশি দামে, কারণ ইরান থেকে চীন তুলনামূলক কম দামে তেল পেত।
)
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এই প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন পথ।
চীনের জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পণ্যও এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে চীনের বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও চাপ পড়তে পারে।
পরিস্থিতির কারণে চীনের বড় শিপিং কোম্পানি কসকো এই পথ দিয়ে নতুন বুকিং বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে ডেনমার্কের শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুট স্থগিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাড়তে থাকা বাণিজ্য
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার পর চীন নতুন বাজার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঝুঁকেছে।
২০২৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি বিশ্বে অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত হারে বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন চীনা গাড়ির সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা বাজার। পাশাপাশি সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনা ইস্পাতের চাহিদা দ্বিগুণ হয়েছে।
এই অঞ্চলে চীনের সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং প্রযুক্তি পণ্যের বাজারও দ্রুত বাড়ছে।
বিনিয়োগ ও ঋণের বিশাল নেটওয়ার্ক
চীন শুধু বাণিজ্যই বাড়ায়নি, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল বিনিয়োগও করেছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করেছে এই অঞ্চলে।
চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তেল শোধনাগার, সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের বৈশ্বিক ঋণ ও অনুদানের মোট পোর্টফোলিওর প্রায় ১০ শতাংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে।
কাতারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র সম্প্রসারণ প্রকল্পেও চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এই প্রকল্পের একটি বড় অংশে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সিনোপেকের অংশীদারিত্ব রয়েছে। সম্প্রতি সেই স্থাপনাগুলোর ওপর হামলাও হয়েছে।
এছাড়া ইসরায়েলের হাইফা বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের খালিফা বন্দরের সম্প্রসারণেও চীনা বিনিয়োগ রয়েছে এবং এসব টার্মিনাল চীনা কোম্পানির পরিচালনায় চলছে।
ইরানে অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্প
ইরানে চীনা কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্ত রয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রিড, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা এবং বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন ও নির্মাণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে পানির সংকট মোকাবিলায় চীন লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্পেও বড় বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং ইরাকে এই ধরনের বেশিরভাগ প্রকল্প নির্মাণ করেছে চায়না পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন।

প্রযুক্তি ও ব্যবসার নতুন কেন্দ্র
দুবাই এখন চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হুয়াওয়ে, আলিবাবা ও টেনসেন্ট সেখানে অফিস স্থাপন করেছে। একই প্রযুক্তি কমপ্লেক্সে মাইক্রোসফট, মেটা ও গুগলের অফিসও রয়েছে।
স্মার্টফোন বাজারেও চীনা ব্র্যান্ড দ্রুত বাড়ছে। ট্রানসিয়ন, শাওমি এবং অনার এখন দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের পরই বাজার দখলের লড়াইয়ে রয়েছে।
শুধু বড় কোম্পানি নয়, অনেক ছোট উদ্যোক্তাও এখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছেন।
দুবাইয়ে চীনা উদ্যোক্তাদের সুযোগ ও উদ্বেগ
চীনা উদ্যোক্তা হাইয়াং ঝাং ২০১৮ সালে দুবাইয়ে চলে যান। তিনি আগে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন, যেখানে চীনা বিনিয়োগকারীদের দুবাইয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করা হয়।
তার মতে, অনেক চীনা বিনিয়োগকারীর জন্য দুবাই এখনও নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উদ্বিগ্ন।
গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা বেশ কিছু চীনা কোম্পানি তাদের কর্মীদের দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি বাইডু সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের রোবোট্যাক্সি পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। একইভাবে খাবার সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম কিটা তাদের কার্যক্রম সীমিত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

চীনা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ইতিমধ্যে তিন হাজারের বেশি চীনা নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংঘাতে একজন চীনা নাগরিক নিহতও হয়েছেন।
তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ঠিক কতজন চীনা নাগরিক কাজ করছেন বা বসবাস করছেন, সে বিষয়ে সরকার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বেইজিং
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার পর চীন কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়িয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরান, ওমান, ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
চীন প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল বিনিয়োগ ও জ্বালানি নির্ভরতার কারণে এই সংঘাত থেকে চীনও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে—যেমনটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বড় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
#চীন #মধ্যপ্রাচ্য #ইরান #তেলবাজার #বিশ্ববাণিজ্য

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















