ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে, আর এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দামের লাফ
এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ট্যাংকারে হামলার কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখন সপ্তম দিনে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা বাড়িয়েছে। জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং আরও প্রতিশোধমূলক আঘাতের সতর্কতা দিয়েছে।

জ্বালানি বাজারে কী ঘটছে
শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করার পর বাজারে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও বেড়ে ৮৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
মাত্র এক সপ্তাহেই এই দুই ধরনের তেলের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর দেশটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। ফলে ইউরোপে পাইকারি গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।

হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। বিশ্বে মোট তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়।
সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বিশেষ করে কাতারের তেল ও গ্যাস ট্যাংকার নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করে।
জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের তুলনায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক শীর্ষ কমান্ডার ঘোষণা করেছেন যে প্রণালীটি কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।
বাস্তবে ইরান সরাসরি প্রণালী বন্ধ করতে না পারলেও হামলার আশঙ্কা এতটাই বেড়েছে যে অনেক জাহাজই ওই পথে চলাচল বন্ধ রেখেছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, তেল ও গ্যাস ট্যাংকারসহ প্রায় ৩০০টি জাহাজ বর্তমানে খোলা সমুদ্রে নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল চীন নিরাপদে তেল ও গ্যাস ট্যাংকার চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংঘাতের নতুন মোড়
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার কাছে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহন সুরক্ষিত রাখতে তারা বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজের জন্য বীমা সহায়তা এবং প্রয়োজনে নৌবাহিনীর পাহারা।
ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেল ট্যাংকারকে সরাসরি নিরাপত্তা দেবে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেন, প্রণালী বন্ধ থাকা সাময়িক ঘটনা। মার্কিন নৌবাহিনী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের বিশাল তেল সম্পদকে “সন্ত্রাসীদের হাত থেকে” বের করে আনা।

রাশিয়ার সম্ভাব্য সুযোগ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়ার জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
তার মতে, যেসব দেশ আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পেত, তারা এখন বিকল্প উৎস খুঁজবে এবং রাশিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

সমুদ্রবীমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর অনেক বড় সামুদ্রিক বীমা প্রতিষ্ঠান ইরানের জলসীমা ও উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের যুদ্ধঝুঁকির বীমা বাতিল করেছে।
এর ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে নতুন বীমা নিতে হচ্ছে এবং এর খরচ অনেক বেশি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুদ্ধঝুঁকির বীমা প্রিমিয়াম ০.২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ট্যাংকারের জন্য একবার যাত্রার বীমা খরচ ২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
একই সঙ্গে ট্যাংকার ভাড়াও দ্রুত বেড়ে গেছে, কারণ নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে গেছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা
ব্যাংক ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
একটি বড় ব্যাংক ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য ব্রেন্ট তেলের সম্ভাব্য দাম বাড়িয়ে পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি মূলত নির্ভর করবে যুদ্ধ কতটা দীর্ঘায়িত হয় এবং ট্যাংকার চলাচল কত দ্রুত পুনরায় শুরু হয় তার ওপর।
সংরক্ষণাগার ভরে যাওয়ার ঝুঁকি
যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সংরক্ষণাগার দ্রুত ভরে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন হলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে অনেক দেশ।
ইরাক ইতিমধ্যেই প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কমিয়েছে বলে জানা গেছে। কুয়েতও সংরক্ষণাগার পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই পথে হাঁটতে পারে।

তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করেছে, দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের অনেক ওপরে যেতে পারে।
তাদের মতে, এই সংকট চলতে থাকলে বিশ্বে মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানির প্রধান সাদ আল কাবি বলেছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















