ফিলিপাইনে এশিয়ার দীর্ঘতম কমিউনিস্ট বিদ্রোহ শেষের পথে—এমনটাই দাবি করছে দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনী। প্রায় ৫৬ বছরের সংঘাতের পর সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী নিউ পিপলস আর্মি এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়। কিন্তু বিদ্রোহী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক নেতা ও বিশ্লেষক মনে করেন, এই ঘোষণা বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।
ফিলিপাইনের পাহাড়ি জঙ্গলে যে ঘাঁটিগুলো একসময় হাজার হাজার গেরিলার আশ্রয়স্থল ছিল, সেগুলোর অধিকাংশই এখন প্রায় খালি। সামরিক বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, একসময়ের বিশাল এই গেরিলা বাহিনী এখন খুবই ক্ষুদ্র আকারে সীমাবদ্ধ।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই দীর্ঘ বিদ্রোহ কি সত্যিই শেষের পথে, নাকি এটি শুধু নতুন রূপে ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে।
শেষের দিকে পৌঁছেছে বলে দাবি সেনাবাহিনীর
ফিলিপাইনের সেনাবাহিনী গত মাসে ঘোষণা দেয়, নিউ পিপলস আর্মির শেষ গেরিলা “ফ্রন্ট” বা সংগঠিত ঘাঁটিটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ফিলিপাইন সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আন্তোনিও গুস্তিলো নাফারেতের ভাষায়, একটি গেরিলা ফ্রন্ট মানে কেবল কয়েকজন যোদ্ধা নয়। এতে থাকে সশস্ত্র গেরিলা সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় সমর্থকদের একটি শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি।
তার মতে, শেষ ফ্রন্টটি ভেঙে দেওয়া মানে সংগঠিত ভূখণ্ডভিত্তিক শক্তি হিসেবে নিউ পিপলস আর্মির অবসান।

ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখে তিনি বলেন, “আমরা প্রায় শেষ রেখার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।”
তিনি বিদ্রোহীদের বর্তমান সদস্যসংখ্যা জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেন, তাদের শক্তি এখন “খুবই নগণ্য”।
সেনাবাহিনীর কৌশল বদলে যাচ্ছে
বিদ্রোহ দুর্বল হয়ে পড়ায় ফিলিপাইনের সেনাবাহিনী নিজেদের কৌশল ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতিও বদলাতে শুরু করেছে।
আগে তাদের অধিকাংশ অভিযান ছিল ছোট ছোট ইউনিটভিত্তিক, যা মূলত জঙ্গলে গেরিলাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতো। এখন তারা বড় আকারের সামরিক অভিযান, ব্রিগেড বা ডিভিশন পর্যায়ের প্রশিক্ষণে জোর দিচ্ছে।
নাফারেতে বলেন, ভবিষ্যতে দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূখণ্ড রক্ষাই হবে প্রধান লক্ষ্য। অর্থাৎ, সেনাবাহিনী এখন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পাশাপাশি বাহ্যিক হুমকির দিকেও বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদ্রোহ দমনে এতদিনে যে সাফল্য এসেছে তা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেনাবাহিনীর অবস্থান বা উপস্থিতি পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হবে না।
একসময় ছিল শক্তিশালী আন্দোলন
আজকের দুর্বল অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে নিউ পিপলস আর্মির অতীত ছিল অনেক শক্তিশালী।

১৯৮০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ফার্দিনান্দ মারকোস সিনিয়রের শাসনের শেষদিকে, এই আন্দোলনের প্রায় ২০ হাজার সশস্ত্র গেরিলা সদস্য ছিল। এছাড়া এক মিলিয়নেরও বেশি ফিলিপিনো নাগরিক তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল বলে দাবি করা হয়।
১৯৮৬ সালে সে সময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুয়ান পন্সে এনরিলে পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন যে, কমিউনিস্ট বিদ্রোহীরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যেখানে তারা রাজধানী ম্যানিলার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারত।
এই বিদ্রোহ কেবল পাহাড়ি গেরিলাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টি “ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট” নামে একটি জোট গঠন করে, যাতে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন যুক্ত হয় এবং আন্দোলনকে একটি বেসামরিক রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়।
২০১৮ সালেও কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হোসে মারিয়া সিসন দাবি করেছিলেন, নিউ পিপলস আর্মির শতাধিক গেরিলা ফ্রন্ট রয়েছে এবং ফিলিপাইনের ৮১টি প্রদেশের মধ্যে ৭৩টিতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। তার মতে, দলটির সদস্যসংখ্যা তখন প্রায় এক লাখ।
২০২২ সালে মৃত্যুর আগে সিসন বলেছিলেন, আন্দোলন তার মৃত্যুর পরেও টিকে থাকবে এবং সেনাবাহিনীর ভেতরেও তাদের সমর্থক রয়েছে।
তবে সরকার ২০২১ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
কেন দুর্বল হয়ে পড়ল বিদ্রোহ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা রোনাল্ড লামাস এই বিদ্রোহের পতনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দেখিয়েছেন।
প্রথম কারণ রাজনৈতিক।
তার মতে, একটি দেশে গণতান্ত্রিক পরিসর যত বেশি বিস্তৃত হয়, সশস্ত্র বিদ্রোহের যুক্তি তত দুর্বল হয়ে যায়।
মারকোসের স্বৈরশাসনের পর ফিলিপাইনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হওয়ায় বিদ্রোহীদের সেই যুক্তি আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য থাকেনি যে, ব্যবস্থার ভেতর থেকে পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় কারণ আদর্শগত দুর্বলতা।
নিউ পিপলস আর্মি মূলত মাওবাদী মতাদর্শ অনুসরণ করত। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে মাওবাদী বিপ্লবী ধারা আগের মতো শক্তিশালী নেই। এমনকি চীনেও সেই পুরোনো আদর্শ আর নেই বলে লামাস উল্লেখ করেন।
তৃতীয় কারণ প্রযুক্তি।
স্যাটেলাইট নজরদারি, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং আধুনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার কারণে সেনাবাহিনী এখন বিদ্রোহীদের অনেক বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে।
২০২২ সালে সামরিক অভিযানে সন্দেহভাজন বিদ্রোহী নেতা বেনিতো তিয়ামজোন এবং তার স্ত্রী উইলমা তিয়ামজোন নিহত হন। এই ঘটনা সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়।
যে সংগঠন দীর্ঘদিন গোপনীয়তা এবং দ্রুত চলাচলের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে সেই সুবিধা এখন অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।
তবুও বিদ্রোহ পুরোপুরি শেষ নয়?
তবে অনেকেই মনে করেন, বিদ্রোহ এত সহজে শেষ হবে না।
৮৬ বছর বয়সী সতুর ওকাম্পো, যিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং সরকারের সঙ্গে প্রথম শান্তি আলোচনার অংশ ছিলেন, তিনি মনে করেন বিদ্রোহ এখনো শেষ হয়নি।

তার মতে, বিদ্রোহী নেতৃত্বের একটি বড় অংশ অবশ্যই নিহত হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের শিকড় এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আপনি বলতে পারেন না যে আন্দোলন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অনেক এলাকাকে সরকার বিদ্রোহমুক্ত ঘোষণা করেছে, কিন্তু কিছু জায়গায় আবার নতুন করে কার্যক্রম বাড়ছে। বিশেষ করে নেগ্রোস অঞ্চলে।”
ওকাম্পোর মতে, কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাপ্তি একতরফাভাবে ঘোষণা করা যায় না। বিদ্রোহীরা নিজেরাই যদি আত্মসমর্পণ না করে বা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না হয়, তবে সংঘাত শেষ হয়েছে বলা কঠিন।
দুতের্তের সঙ্গে ভুল হিসাব
ওকাম্পো স্বীকার করেন, বিদ্রোহীদের একটি বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তেকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করা।
দুতের্তে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অভিযান শুরু করেন।
ওকাম্পোর ভাষায়, বিদ্রোহীরা সেই সময় প্রতারিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, দুতের্তে ক্ষমতায় এসে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি এখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করবেন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো গুরুত্ব নেই।
সমস্যার মূল এখনো রয়ে গেছে
ওকাম্পোর মতে, দেশের গ্রামীণ এলাকায় বৈষম্য, শোষণ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি হারানোর মতো সমস্যাগুলো সমাধান না হলে নতুন প্রজন্মের কেউ না কেউ আবার অস্ত্র তুলে নেবে।

তিনি বিশেষ করে তরুণদের কথা উল্লেখ করে বলেন, সামাজিক অবিচার থাকলে আন্দোলন বিভিন্ন রূপে চলতেই পারে—সশস্ত্র কিংবা অসশস্ত্র।
তবে তিনি এটাও বলেন, সরকার যদি আন্তরিকভাবে আলোচনা করতে চায়, তাহলে আন্দোলনের পক্ষ থেকেও শান্তি আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক সমাধানই শেষ পথ
ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর ভেতরেও কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই ধরনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
একজন জ্যেষ্ঠ জেনারেল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্রোহ সাধারণত সেই এলাকাগুলোতেই শক্তিশালী হয় যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা বেশি।
তার মতে, সেনাবাহিনী অনেক সময় মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সাহায্য করার চেষ্টা করে—যেমন পানির ব্যবস্থা বা রাস্তা নির্মাণ। কিন্তু শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা তাদের কাজ নয়।
শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।
ফিলিপাইনের পাহাড়গুলো হয়তো এখন আগের তুলনায় অনেক শান্ত। কিন্তু দেশটির দীর্ঘ ইতিহাস দেখিয়েছে—নীরবতা মানেই স্থায়ী শান্তি নয়। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই বিদ্রোহ হয়তো এখন দুর্বল, কিন্তু তা পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এখনো খোলা রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















