দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব এখন পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর সুযোগে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারেও। কৃষকরা কম দামে পচনশীল পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামনে ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জ্বালানি রেশনিংয়ে পরিবহন সংকট
সংকট মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করেছে। ফলে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হাসানুল কবির জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত পণ্য পরিবহনে তেমন সমস্যা বোঝা না গেলেও রোববার থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে তেলের সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কিছু গাড়ি তেল পেলেও পরিমাণ খুবই কম। সরকার যেখানে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের জন্য ২২০ লিটার তেল কেনার সীমা নির্ধারণ করেছে, সেখানে অনেক পাম্পে প্রতি গাড়িকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে দূরপাল্লার পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানি পণ্য ও ঈদকে সামনে রেখে পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বগুড়ায় ট্রাকভাড়া বাড়ায় পণ্যের দাম বৃদ্ধি
বগুড়ায় গত এক সপ্তাহে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। শহরের দত্তবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জামিলুর রহমান জানান, এক সপ্তাহ আগে যে রড টনপ্রতি ৯৪ হাজার টাকায় কিনেছিলেন, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ৯৯ হাজার টাকায়। একইভাবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের দামও বস্তাপ্রতি অন্তত ৩০ টাকা বেড়েছে।
রড ব্যবসায়ী অনিক হাসান বলেন, আগে চট্টগ্রাম থেকে এক ট্রাক রড আনতে ভাড়া লাগত ২২ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে প্রায় ২৭ হাজার টাকা হয়েছে। ঢাকা থেকে রড আনতে ভাড়া বেড়ে ১৩ হাজার থেকে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার টাকায়। ঢেউটিন ব্যবসায়ীরাও প্রতি টিনে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন।
কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত, বাড়ছে সবজির ভাড়া

পরিবহন সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বগুড়ার মহাস্থান দেশের অন্যতম বড় সবজির বাজার, এখান থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সবজি পাঠানো হয়। আগে ঢাকায় এক ট্রাক সবজি পাঠাতে ভাড়া লাগত ১৪ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা।
মহাস্থান মুক্তি ফলভান্ডারের মালিক রহেদুল ইসলাম জানান, এক সপ্তাহ আগে পটুয়াখালী থেকে এক ট্রাক তরমুজ আনতে ভাড়া দিতে হয়েছিল ২৮ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া বেড়ে আরও সাত হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে তরমুজের দামও বাড়াতে হয়েছে। আগে প্রতি কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৫ টাকায়।
চালের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। শেরপুরের সাহা চালকলের মালিক প্রদীপ সাহা জানান, এক সপ্তাহ আগে হবিগঞ্জে চাল পাঠাতে ট্রাক ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টাকা। এতে চালের দামও বেড়েছে। আগে ২৫ কেজির কাটারি চাল বিক্রি হতো ১ হাজার ৮০০ টাকায়, এখন তা বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়।
রাজাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ জানান, জয়পুরহাটের হিলি থেকে পণ্য আনতে প্রতি টনে ভাড়া ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৭৫০ টাকা হয়েছে।

ট্রাকচালকদের ভোগান্তি বাড়ছে
ট্রাকচালক সাজু মিয়া বলেন, তেল সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। পাম্পে পাম্পে ঘুরেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বগুড়া জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিন্টু খান জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ট্রাক অলস পড়ে আছে। এতে ঈদের আগে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
কুমিল্লায় ট্রাক পাওয়া কঠিন
কুমিল্লায় আড়তদাররা আগের তুলনায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিয়েও ট্রাক পাচ্ছেন না। নিমসার কাঁচাবাজারে দিনাজপুর থেকে আলু নিয়ে আসা ট্রাকচালক আমজাদ আলী জানান, আগে যেখানে ট্রাক ভাড়া ছিল ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, পথে পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্প ঘুরে জ্বালানি নিতে হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও থেকে আসা আরেক চালক রমিজ উদ্দিন বলেন, আগে ট্রাক ভাড়া ছিল প্রায় ২৯ হাজার টাকা, এখন মালিকরা নিচ্ছেন ৩৪ হাজার টাকা।

নওগাঁয় তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন
নওগাঁয় সংকটের আশঙ্কায় অনেক ট্রাকচালক আগেভাগেই ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভিড় করছেন। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। ফলে ভাড়াও বেড়েছে। আগে নওগাঁ থেকে ঢাকায় একটি ট্রাক ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে।
নওগাঁ শহরের ট্রাক টার্মিনালের চালক দুলাল হোসেন বলেন, আমার প্রয়োজন ৩০ লিটার তেল, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে মাত্র পাঁচ লিটার। এত কম তেলে বগুড়া পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব নয়, ঢাকায় যাওয়া তো আরও কঠিন। ফলে অনেক বুকিং করা ট্রিপ বাতিল করতে হয়েছে।
সাতক্ষীরায় শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহনে স্থবিরতা
সাতক্ষীরায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও প্রভাব পড়েছে। মাছ, শাকসবজি ও অন্যান্য কাঁচামাল সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না।

শহরের বড় বাজার কাঁচামাল সমিতির সভাপতি রওশান আলী বলেন, তেল সংকট অব্যাহত থাকলে সবজির বাজারেও সংকট দেখা দিতে পারে। জেলা ট্রাক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আমিনুর রহমান জানান, অনেক পাম্পে গাড়িপ্রতি মাত্র ১০০ থেকে ১২০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দূরপাল্লার পরিবহনের জন্য যথেষ্ট নয়।
যশোরে বাস চলাচলেও প্রভাব
যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার ২২টি রুটে বাস চলাচল করে। সোমবার দুপুরে দেখা গেছে, কিছু বাস যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কিছু বাস বন্ধ রয়েছে।
যশোর পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্তজা বলেন, কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















