রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কা পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি বাড়ছে। অনেক দেশে সপ্তাহান্তের ছুটির দিনেই সাধারণ মানুষ সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, শিখছেন কীভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেদের দেশকে রক্ষা করতে হয়।
লিথুয়ানিয়ায় এমন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা কার্যক্রম এখন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। পেশায় কেউ সফটওয়্যার নির্মাতা, কেউ বারকর্মী বা বিক্রয়কর্মী—কিন্তু সপ্তাহান্তে তারা হয়ে উঠছেন প্রতিরক্ষার স্বেচ্ছাসেবী সদস্য।
সীমান্তের কাছে সপ্তাহান্তের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ
বেলারুশ সীমান্তের কাছাকাছি পাব্রাদে নামের একটি সামরিক ঘাঁটিতে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই প্রশিক্ষণে অংশ নেন লিথুয়ানিয়ার স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা সংগঠনের সদস্যরা। তারা সাঁজোয়া যান চালানো, ট্রেঞ্চ আক্রমণ করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে চলাচলের কৌশল শিখছেন।
লিথুয়ানিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে নিরাপত্তা উদ্বেগে রেখেছে। একদিকে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চল, অন্যদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর থেকে দেশটির এই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অনেক সদস্য নিজের অর্থে নিজেদের সরঞ্জামও কিনে নিচ্ছেন।
‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা’ কৌশলে সাধারণ নাগরিক
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা নীতিতে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী শুধু সেনাবাহিনী নয়, পুরো সমাজই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রতিটি নাগরিক—তার বয়স, শিক্ষা বা শারীরিক সক্ষমতা যাই হোক না কেন—জাতীয় প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখবে, এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
রাশিয়া সীমান্তে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর দ্রুত বৃদ্ধি
রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে এস্তোনিয়ার স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা সংগঠনের সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে হাজার হাজার নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছেন।
তবে এই প্রবণতার সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, লিথুয়ানিয়ার স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর একজন সদস্য বেলারুশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এর ফলে নতুন সদস্যদের যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দায়িত্বের সংঘাত। অনেক স্বেচ্ছাসেবী একই সঙ্গে পুলিশ বা উদ্ধার সেবার কাজেও যুক্ত থাকেন। বড় কোনো সংকট দেখা দিলে এসব সেবায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধ হলে নাগরিকদের ভূমিকা কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া যদি কখনো লিথুয়ানিয়ায় আক্রমণ চালায়, তখন স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই সরাসরি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেবেন। অধিকাংশ সদস্য পেছনের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সহায়ক দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে এই সংগঠনগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে নাগরিকদের সচেতন করা। কয়েক বছর ধরে স্কুল পর্যায়েও প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে, যেখানে তরুণ প্রজন্মকে সংকট পরিস্থিতিতে টিকে থাকার কৌশল শেখানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের এই সম্পৃক্ততা সমাজকে আরও স্থিতিশীল ও প্রস্তুত করে তোলে। অনেক সময় তারাই স্থানীয় মানুষের কাছে সংকট মোকাবিলার বাস্তব পরামর্শ পৌঁছে দেয়।
প্রতিরোধই মূল লক্ষ্য
লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের আসল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং প্রতিরোধ তৈরি করা। বার্তা স্পষ্ট—দেশে শুধু সেনাবাহিনীই নয়, পুরো সমাজই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত।
তাদের বিশ্বাস, এমন প্রস্তুতি রাশিয়ার কাছেও একটি শক্ত বার্তা দেয় যে কোনো আগ্রাসনের চেষ্টা সহজ হবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















