মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এ ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ দেশটির ভেতরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও এই বোর্ডে যোগদানের সিদ্ধান্ত এখন কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
দেশটির বিভিন্ন মহল থেকে জাকার্তাকে এই বোর্ড থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে গাজায় সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিও পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও বলছেন, তার অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমালোচনার মুখে সরকারের অবস্থান
প্রাবোও আগেই বলেছেন, যদি এই সংগঠন ফিলিস্তিনিদের কোনো উপকারে না আসে, তাহলে তিনি এখান থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো গত সপ্তাহে জানান, ইরান পরিস্থিতির কারণে ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে আলোচনা আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে এখনো ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই বোর্ডের সদস্য।
জাকার্তায় সীমিত আকারে বিক্ষোভ হয়েছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও মানবাধিকার সংগঠন সরকারকে এই সংগঠন ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে আবেদনপত্র দিয়েছে।
ন্যাশনাল কনসায়েন্স মুভমেন্ট নামে এক ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ১৯৪৫ সালের সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্টকে ‘বোর্ড অব পিস’ থেকে ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং গাজায় সেনা পাঠানোর পরিকল্পনাও বাতিল করতে হবে।
সরকারের পাল্টা ব্যাখ্যা
সরকারি কর্মকর্তারা সমালোচনা কমাতে চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, ইন্দোনেশিয়া এখনো নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে আগের মতোই সক্রিয় থাকবে।
সোমবার এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও বলেন, ইন্দোনেশিয়া সঠিক পথেই রয়েছে। দেশটি সবসময়ই স্বাধীন, সক্রিয় এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী কার্যালয় শনিবার ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রস্তাবিত গাজা শান্তি কাঠামোর ২০ দফা বিশ্লেষণ করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশ করে।
প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ উলতা লেভেনিয়া বলেন, এই কাঠামোয় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জনের পথ রয়েছে। ভাষা হয়তো ভিন্ন, কিন্তু এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অব পিস’ থেকে সরে আসা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং গাজায় সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা বন্ধ করার দাবিগুলো দেখাচ্ছে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রাবোওর ঘনিষ্ঠতা ইন্দোনেশিয়ার জনগণের বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক শোফওয়ান আল বান্না চোইরুজ্জাদ বলেন, বিভিন্ন মহলের এই দাবিগুলো দেখাচ্ছে যে ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত এই বোর্ডের প্রতি জনগণের আস্থা খুবই কম।
তার মতে, প্রাবোওকে তার পদক্ষেপগুলো নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ এগুলো পর্যাপ্ত কৌশলগত হিসাব ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে এবং এর ফলে ইন্দোনেশিয়া ধীরে ধীরে তার কৌশলগত স্বাধীনতা হারাতে পারে।
অন্যদিকে গাজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সিতি মুতিয়াহ সেতিয়াওয়াতি মনে করেন, সরাসরি বোর্ড ছাড়ার বদলে ইন্দোনেশিয়া ‘নীরবভাবে সরে দাঁড়ানোর’ কৌশল নিতে পারে।
তার মতে, যদি কোনো বৈঠকের আমন্ত্রণ আসে, তাহলে তাতে অংশ না নেওয়া বা বোর্ডের কার্যক্রমে সক্রিয় না থাকা একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হতে পারে। সরাসরি ঘোষণা দিয়ে সরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক চাপের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সোমবার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের কারণে কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
সোমবার সকালের লেনদেনে রুপিয়াহ মুদ্রা সাময়িকভাবে ডলারের বিপরীতে ১৭,০০৯ পর্যন্ত নেমে যায়। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে যায়, যা ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সর্বোচ্চ।
এদিকে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়ার জরুরি তেল মজুত মাত্র প্রায় ২০ দিনের জন্য যথেষ্ট। এই খবর প্রকাশের পর আচেহ, পূর্ব কালিমান্তান এবং ব্যাংকা বেলিতুং দ্বীপপুঞ্জে জ্বালানি কেনার হিড়িক পড়ে যায়।
অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া জানিয়েছেন, তেলের দাম বাড়লেও সরকার আপাতত জ্বালানির মূল্য বাড়াবে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নতুন সতর্কতা
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ‘অ্যালার্ট ১’ নামে এই সতর্কতার আওতায় বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, রেলস্টেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।
যদিও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি ইন্দোনেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েনি, তবু এর প্রভাব ইতোমধ্যে অনুভূত হচ্ছে। গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পতাকাবাহী টাগবোট ‘মুসাফাহ ২’-এ আগুন লাগার ঘটনায় তিনজন ইন্দোনেশীয় নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন।
ঘটনায় একজন ইন্দোনেশীয় নাবিক গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন এবং বর্তমানে ওমানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শান্তি প্রচেষ্টায় বিকল্প পথ
বিশ্লেষক শোফওয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার প্রভাব প্রাবোওকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে আরও সক্রিয় করতে পারে।
তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া নিশ্চয়ই নীরব থাকতে পারে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা আরও কার্যকর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















