মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাবে এশিয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) স্পট মূল্য হঠাৎ করেই দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা একাধিক এলএনজি ট্যাংকার মাঝপথে দিক পরিবর্তন করে এশিয়ার বাজারের দিকে যেতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এত উচ্চ মূল্যে গ্যাস কেনা তাদের পক্ষে কঠিন হওয়ায় জ্বালানি সংকট এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানিকৃত অধিকাংশ এলএনজি হরমুজ প্রণালী হয়ে এশিয়ায় পৌঁছায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি বিস্তৃত হওয়ায় এই রুটে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারে, যেখানে এশিয়ার গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইউরোপকে ভবিষ্যতে বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য করতে পারে, যাতে তারা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট এড়াতে পারে।

মাঝপথে পথ বদলাচ্ছে জাহাজ
ইউরোপীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের জাহাজ অনুসরণ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে যাত্রা করা এলএনজি ট্যাংকার এলিসা আরডিয়া প্রথমে নেদারল্যান্ডসের একটি আমদানি টার্মিনালের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু শুক্রবার আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝপথে জাহাজটি দক্ষিণ দিকে ঘুরে জাপানের চিবা অঞ্চলের একটি বন্দরের দিকে নতুন পথ নির্ধারণ করে।
প্রায় ৩ মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে শুরু করলে ইউরোপমুখী আরও কয়েকটি এলএনজি ট্যাংকার একের পর এক এশিয়ার দিকে ঘুরে যায়। কিছু জাহাজ আটলান্টিকের মাঝামাঝি অবস্থানেই পথ বদলায় এবং ধারণা করা হচ্ছে তারা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে এশিয়ার দিকে যাচ্ছে।
ক্লেপলারের প্রধান বিশ্লেষক গো কাটায়ামা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়ার পর অন্তত সাত থেকে আটটি জাহাজ পথ পরিবর্তন করেছে। এলএনজি ট্যাংকারের মাঝে মাঝে পথ বদলানো অস্বাভাবিক নয়, তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি জাহাজের দিক পরিবর্তন করা বিরল ঘটনা।
দামের ব্যবধান বাড়তেই এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে জাহাজ
এশিয়া ও ইউরোপের গ্যাস বাজারের দামের ব্যবধান দ্রুত বাড়ায় জাহাজগুলো বেশি দামের বাজারের দিকে যেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া থেকে আসা এলএনজি চুক্তিগতভাবে পুনরায় বিক্রি করা যায়, ফলে এসব জাহাজ সহজেই গন্তব্য পরিবর্তন করতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির প্রকাশিত জাপান-কোরিয়া মার্কার সূচক অনুযায়ী, এশিয়ায় এপ্রিল ডেলিভারির এলএনজির স্পট মূল্য সোমবার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককে ২৪ দশমিক ৮০ ডলারে পৌঁছায়।
২৭ ফেব্রুয়ারিতে এই দাম ছিল তার অর্ধেকেরও কম, অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়ার আগে থেকে এখন দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপে গ্যাসের স্পট মূল্য প্রতি মিলিয়ন তাপ এককে প্রায় ২০ থেকে ২১ ডলার।
কাতারের ঘোষণা বাড়িয়ে দিয়েছে চাপ
এশিয়ার বাজারে দামের এই উল্লম্ফনের বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ৪ মার্চ কাতারএনার্জির ফোর্স মেজর ঘোষণা। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের কাছে নির্ধারিত সরবরাহের বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত হয়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির বিশেষজ্ঞ আতসুকো কাওয়াসাকি বলেন, বাস্তবে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সরবরাহের টানাপোড়েন মিলিয়ে গ্যাসের দাম আরও বাড়ছে।

এশিয়ার দেশগুলোর ওপর প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজির প্রধান উৎস কাতার। প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি হয়, যার প্রায় ৯০ শতাংশই যায় এশিয়ায়।
চীন বছরে প্রায় দুই কোটি টন এলএনজি কিনে এই তালিকার শীর্ষে। এটি দেশটির মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে চীনের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানির বিকল্প রয়েছে।
অন্যদিকে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাইওয়ান বছরে প্রায় ৮২ লাখ টন মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজি আমদানি করে, যা তাদের মোট আমদানির ৩৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৭৪ লাখ টন আমদানি করে, যা মোটের প্রায় ১৫ শতাংশ। এই দুই দেশের নিজস্ব উৎপাদন বা পাইপলাইন আমদানির সুযোগ নেই।
জাপানের জন্যও বাড়ছে চাপ
জাপান বছরে প্রায় ৪১ লাখ টন মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজি আমদানি করে, যা তাদের মোট আমদানির মাত্র ৬ শতাংশ। তবে চলতি বছরে জাপানের কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ নির্ধারিত রয়েছে। ফলে দেশটিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে।
রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক মাসানোরি ওডাকা বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং জাপানকে স্পট বাজার থেকে বিকল্প সরবরাহ সংগ্রহ করতে হতে পারে।
ইউরোপে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা
এশিয়ার দিকে জাহাজ ঘুরে যাওয়ায় ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের চাপ বাড়ছে। ইতালি ও আরও কয়েকটি দেশ কাতারের গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং তাদের নিজস্ব মজুত সীমিত।
গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস মজুত ধারণক্ষমতার ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন।
জাপানের এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড সোসাইটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গো মাতসুও বলেন, শেষ পর্যন্ত ইউরোপকে গ্যাস কিনতেই হবে। তখন এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু হবে এবং দুই অঞ্চলের বাজারেই গ্যাসের দাম আরও বাড়বে।
উদীয়মান অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকি
উচ্চ দামের কারণে এশিয়ার কিছু অর্থনীতি ইতিমধ্যে গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। ভারতের বড় আমদানিকারক পেট্রোনেট এলএনজি ৩ মার্চ হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ করে ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশও কাতারের সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু এত উচ্চ মূল্যে গ্যাস কেনা এসব দেশের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে জ্বালানি সংকটের কারণে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর একই ধরনের পরিস্থিতিতে এই দুই দেশেই বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















