বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের খার্গ দ্বীপের নিরাপত্তার ওপর। এই দ্বীপে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং দ্রুতই দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
খার্গ দ্বীপ: ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র
আরব উপসাগরে অবস্থিত ছোট এই দ্বীপটি ইরানের তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইরান যে তেল বিশ্ববাজারে পাঠায়, তার প্রায় দশটির মধ্যে নয়টি ব্যারেলই খার্গ দ্বীপ থেকে রপ্তানি হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় এই টার্মিনালটি অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমানে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল এই টার্মিনালের মাধ্যমে রপ্তানি করে। এই পরিমাণ উৎপাদন অনেক ওপেক সদস্য দেশের মোট উৎপাদনের চেয়েও বেশি। তাই এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ ১৯৬০-এর দশক থেকেই দেশের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তখন এটি উন্নয়ন করেছিল একটি মার্কিন কোম্পানি, পরে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটি জাতীয়করণ করা হয়।
ইরানের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল সমুদ্রের নিচের পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে আনা হয়। এখানে বিশাল ট্যাংকে তা সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে ট্যাঙ্কারে তুলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।
এই টার্মিনালে প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। একসঙ্গে আটটি ট্যাঙ্কার এখানে ভিড়তে পারে। পাশাপাশি জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় এখানে দিনে ৬০ লাখ ব্যারেল তেল লোড করা সম্ভব এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তা ১ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই বিশাল সক্ষমতার কারণে বিশ্ববাজারে ইরানের তেলের প্রবাহ বোঝার জন্য ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এই টার্মিনালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।

রপ্তানি প্রবাহ ও নজরদারি
খার্গ দ্বীপ থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের বড় অংশই যায় চীনে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের সঙ্গে এশিয়ার জ্বালানি বাজারের সংযোগে এই টার্মিনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও বাজার বিশ্লেষকেরা এখানকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, যাতে বোঝা যায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানিতে কতটা প্রভাব ফেলছে।
লোডিং সূচি বা রপ্তানির পরিমাণে সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও তা দ্রুত তেলের দামে প্রভাব ফেলে, কারণ বাজারের অংশগ্রহণকারীরা তখন বৈশ্বিক সরবরাহ সম্পর্কে নতুন হিসাব কষতে শুরু করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার আগে খার্গ দ্বীপে তেল লোডিং বৃদ্ধি করেছিল ইরান। উত্তেজনা বাড়ার পরও সেখানে ট্যাঙ্কারগুলোতে তেল ভরার কাজ চলতে দেখা গেছে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৭ মার্চ সেখানে দুটি বড় তেলবাহী জাহাজ টার্মিনালে অবস্থান করছিল এবং আশপাশে আরও কয়েকটি ট্যাঙ্কার নোঙর করে ছিল।
হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি
খার্গ দ্বীপ থেকে বের হওয়া সব তেলবাহী জাহাজকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে হয়। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার পর থেকে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
এমনকি খার্গ দ্বীপে তেল লোডিং চলতে থাকলেও যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো তেলের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
খার্গ দ্বীপে কোনো ধরনের বড় বিঘ্ন ঘটলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের জন্য ইরানের বেশিরভাগ তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতি তখন আরও জটিল হয়ে উঠবে, যখন বিশ্ববাজারে তেলের মজুদ ইতোমধ্যে সীমিত। ফলে সরবরাহ কমে গেলে তেলের দামে দ্রুত উল্লম্ফন ঘটার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তেল ব্যবসায়ীদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বড় অর্থনীতিগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় খার্গ দ্বীপের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কারণে এই টার্মিনালকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের তেল সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যতম স্পর্শকাতর কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















