মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান বোমা হামলার মধ্যেই ইরান তার সামরিক কৌশল দ্রুত বদলে নিচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এগিয়ে রয়েছে, তবুও ইরানের নতুন কৌশল যুদ্ধের পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমানভাবে টিকে থাকা ইরানের পক্ষে কঠিন। তাই তারা এমন জায়গায় আঘাত হানছে, যেখানে মার্কিন বাহিনীর দুর্বলতা রয়েছে—বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো।
যুদ্ধ শুরুর ১১ দিনে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ
যুদ্ধ শুরুর পর গত ১১ দিনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা।
ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা এমন সব হোটেলে হামলা চালিয়েছে যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন। ইরাকের এরবিলে একটি বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোনের ঝাঁক দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে বোঝা যায়, ওই এলাকায় পেন্টাগন সেনাদের কোথায় রাখছে সে বিষয়ে ইরানের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা মনে করছে, শুধু এই হামলার মধ্যেও টিকে থাকতে পারলেই তেহরান সরকার রাজনৈতিকভাবে নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারবে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১৪০ জন। তাদের মধ্যে ১০৮ জন ইতোমধ্যে আবার দায়িত্বে ফিরেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন।
পূর্বের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ ব্যবহার হয়ে যায়। সেই সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০ থেকে ২৫০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল, যা তাদের মোট মজুদের প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ।

এ ছাড়া প্রায় ৮০টি এসএম-৩ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট মজুদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ ভ্যালি আর. নাসর বলেন, খুব দ্রুতই ইরান আগের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার জায়গা।
তার মতে, এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরেও ইরানের কাছে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা রয়ে গেছে।
কৌশল পরিবর্তনের কথা স্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেছেন যে ইরান তাদের যুদ্ধের কৌশল বদলেছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো পরিকল্পনাই আগের মতো থাকে না। তারা যেমন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, আমরাও তেমনই নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছি।
তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরান কীভাবে কৌশল বদলাচ্ছে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
)
রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় হামলা
সম্প্রতি ইরান কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটির একটি আগাম সতর্কতা রাডার ব্যবস্থায় হামলা চালায়, এতে উন্নত প্রযুক্তির রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মার্কিন সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় কোন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। তবে হামলার ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় ব্যবস্থাকে ব্যাহত করাই ছিল ইরানের উদ্দেশ্য।
এ ছাড়া কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ঘাঁটির তিনটি রাডার গম্বুজেও হামলা চালানো হয়েছে।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার কাছে অন্তত ছয়টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে।
এদিকে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হামলার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ডলার বলে কংগ্রেসকে দেওয়া পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ড্রোন হামলার নতুন ধরণ

আগে ইরান মূলত ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাত। কিন্তু এবার তারা কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক ও বাহরাইনের মতো দেশে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে হাজার হাজার সস্তা একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর এত বড় আকারে হামলা চালাবে—এটি পেন্টাগনের প্রত্যাশার বাইরে ছিল।
তবে তিনি দাবি করেন, এসব হামলা শেষ পর্যন্ত ইরানের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনছে।
তার ভাষায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালানো ইরানের বড় ভুল। এতে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সবার সামনে প্রকাশ পেয়েছে।
মার্কিন হামলায় ইরানের আক্রমণ কমেছে
জেনারেল কেইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বিমান হামলার ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তার মতে, যুদ্ধের শুরুতে যত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, এখন তা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। একইভাবে একমুখী ড্রোন হামলাও প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে গেছে।
তবে হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরানের সব ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে এখনো পেন্টাগনের পূর্ণ তথ্য নেই।

গোপনে সংরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র
কর্মকর্তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু যেমন মার্কিন রাডার বা সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার জন্য ইরান অনেক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করে রেখেছে।
কংগ্রেসকে দেওয়া গোপন ব্রিফিংয়ে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় প্রতিদিনই সেই সক্ষমতা কমছে।
বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসরের মতে, প্রথম দফার হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হয়তো কেবল পথ খুলে দেওয়ার কৌশল ছিল। পরে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হতে পারে।
নেতা নিহত হলেও থামেনি যুদ্ধ
কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পরও দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
ইরান এখনো কার্যকরভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কর্মকাণ্ডে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না যে নেতৃত্ব হারিয়ে তারা অচল হয়ে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















