মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের মাইন পাতা সক্ষম বেশ কয়েকটি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, মোট ১৬টি ইরানি মাইন পাতা জাহাজকে লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করা এসব জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। পোস্টটির সঙ্গে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গোলাবারুদ আঘাত হানছে অন্তত নয়টি জাহাজে। হামলার সময় বেশিরভাগ জাহাজই নোঙর করা অবস্থায় ছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর মাইন পাতা হয়েছে কি না অনিশ্চিত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান সমুদ্রে কোনো মাইন বসিয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল ইরান প্রণালীতে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যদিও তারা তখনো কার্যক্রম শুরু করেনি।
এই প্রস্তুতির খবর ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। ফলে হোয়াইট হাউস সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেয় ইরানের মাইন পাতা সরঞ্জাম ও সক্ষমতার ওপর হামলা চালাতে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এটি পারস্য উপসাগরকে উত্তর আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরানের দক্ষিণ উপকূল এই প্রণালীর পাশ দিয়ে বিস্তৃত।
এই পথ দিয়ে যাতায়াত করা সামরিক ও বেসামরিক জাহাজকে প্রায়ই ইরানি কর্তৃপক্ষ সামুদ্রিক রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে, বিশেষ করে যখন তারা উপসাগরে প্রবেশ বা বের হয়।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে বড় বড় তেলবাহী ট্যাংকারে পরিবাহিত হয়।
তেলবাজারে উত্তেজনা
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামও বৃদ্ধি পায়।

ইতিহাসে একই ধরনের সংঘাত
১৯৮০-এর দশকে ইরান পারস্য উপসাগরে মাইন পেতে দেয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে বিশেষ মাইন অপসারণ অভিযান চালাতে হয়।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে একটি ইরানি মাইন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফ্রিগেটকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যদিও জাহাজটি ডুবে যায়নি। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা সামরিক হামলা চালায়।
বাণিজ্যিক জাহাজে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারেন যাতে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
মঙ্গলবার বিকেলে জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, একটি নৌযুদ্ধজাহাজ সফলভাবে একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে প্রণালী পার হতে সহায়তা করেছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন।
পরে এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো বেসামরিক জাহাজকে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন মঙ্গলবার সকালে এক ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন যে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব এখনো পেন্টাগনকে দেওয়া হয়নি।
মাইন অপসারণে আধুনিক প্রযুক্তি
বর্তমানে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণের দায়িত্ব সাধারণত বাহরাইনে অবস্থান করা মার্কিন নৌবাহিনীর টাস্ক ফোর্স ৫৬-এর ওপর পড়ে।
এই ইউনিটে কর্মরত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ নাবিকরা উন্নত স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান ব্যবহার করেন। এসব যন্ত্রে সাইড-স্ক্যান সোনার প্রযুক্তি রয়েছে, যা সমুদ্রতলের সন্দেহজনক বস্তু দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
প্রয়োজনে তারা দূরনিয়ন্ত্রিত যান ব্যবহার করে সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা করেন। প্রশিক্ষিত ডুবুরি হিসেবে তারা প্রায় ৩০০ ফুট গভীর পর্যন্ত নেমে মাইন নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করতে সক্ষম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















