মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। এই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে দৈনন্দিন জীবন ধীরে ধীরে যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। উদ্বেগ, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং আকাশে সামরিক তৎপরতা এখন অনেকের জন্য নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তবে বিস্ময়করভাবে, এই সংঘাতের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জনরোষ মূলত ইরানের দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নয়।
যুদ্ধের ছায়ায় বদলে যাওয়া দৈনন্দিন জীবন
কাতারের দোহায় এক ইফতার-পরবর্তী স্পিন ক্লাসে প্রশিক্ষকের নিয়মিত “ইতিবাচক শক্তি”র বার্তা নতুন অর্থ নিয়ে ধরা দেয়। তিনি বলেন, এখন এই শক্তি আগের চেয়ে বেশি দরকার। জিম থেকে বের হওয়ার পরই মোবাইলে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার শব্দ ভেসে আসে। বিস্ফোরণের শব্দ থামা পর্যন্ত অনেকেই পার্কিং গ্যারেজে অপেক্ষা করেন। বাইরে নিরাপত্তারক্ষীদের কেউ কেউ মাথায় সাদা হেলমেট পরে টহল দিচ্ছেন, যা মূলত আকাশ থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে সামান্য সুরক্ষার জন্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও দৈনন্দিন জীবন বদলে গেছে। দুবাইয়ের সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষজন আকাশে যুদ্ধবিমানকে একটি ড্রোন তাড়া করতে দেখেছেন। রমজানের সময় প্রচলিত কামান নিক্ষেপের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত বিস্ফোরণের শব্দ না হয়। করপোরেট অফিসগুলোতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে, কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। এর পাশাপাশি গুগল ম্যাপসের কিছু ত্রুটির কারণে অনেক ব্যবহারকারীকে ভুলভাবে মরুভূমি বা সমুদ্রে অবস্থান দেখানো হচ্ছে, যা ডেলিভারি কর্মীদের কাজ আরও কঠিন করে তুলছে। এমনকি বাসিন্দাদের ঘুমের সমস্যা কমাতে রাতের মোবাইল সতর্কবার্তার শব্দও কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর একের পর এক হামলার খবর আসতে থাকায় অনেকের প্রতিক্রিয়াও বদলে গেছে। শক্তি খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, এখন একটি ড্রোন হামলার খবরও আর বিস্ময় তৈরি করে না। বরং ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের নির্বাহীরা এটিকে প্রায় একটি অপ্রত্যাশিত রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধের মতো হিসাবের মধ্যে ধরছেন।

কেন ক্ষোভ তেহরানের দিকে
যদিও এই সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবুও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করার ঘটনা খুবই কম। বরং বেশিরভাগ উপসাগরীয় নেতা প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের সমালোচনা এড়িয়ে গেছেন। তাদের বক্তব্যে “বিশ্বাসঘাতকতা” শব্দটি বেশি ব্যবহার হয়েছে তেহরানকে লক্ষ্য করে।
কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর এক পর্যায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অঞ্চলটিকে যুদ্ধে টেনে আনার অভিযোগ করেন। তবে পরে তিনি সেই মন্তব্য প্রত্যাহার করেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি উপসাগরীয় মহলে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও তা প্রকাশ্যে সীমিত রাখার ইঙ্গিত দেয়।
সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসেরও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা না করে বরং যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই সংঘাত বৈশ্বিক তেলের বাজারে গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং এর পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে।

ইরানের পদক্ষেপে বাড়ছে অসন্তোষ
উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেকেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিল। তারা তেহরানকে আশ্বাস দিয়েছিল যে তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে না। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতেও উপসাগরীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়কেই সতর্ক করেছিলেন যে ইরানের ওপর কোনো মার্কিন হামলা হলে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই ইরান উপসাগরীয় আরব ভূখণ্ডে হামলা চালায়। সেই থেকে উপসাগরীয় রাজধানীগুলোতে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে এই পদক্ষেপকে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করেন। তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ থাকার নিশ্চয়তা দিলেও ইরান পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, কাতার একটি শান্তিপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশ বজায় রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ এগিয়ে নিতে কাজ করছিল। কিন্তু ইরানের ভুল হিসাব সেই প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে নতুন ভাবনা
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার সময় নয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব প্রশ্নের মুখে নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতি মার্কিন ও ইউরোপীয় বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে একটি নতুন উপলব্ধিও তৈরি হচ্ছে। একক নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভরতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আঞ্চলিক প্রতিরক্ষায় দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়েছে। যেমন ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমান আমিরাতের আকাশে টহল দিচ্ছে এবং ব্রিটিশ টাইফুন যুদ্ধবিমান কাতারের আকাশে সম্ভাব্য হুমকি প্রতিহত করছে।
একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাওয়ার পদক্ষেপ নয়, বরং নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের পরিসর বাড়ানোর প্রক্রিয়া। তার মতে, ভবিষ্যতে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কেউ কেউ চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে, কেউ ইসরায়েল বা ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে, আবার কেউ তুরস্ক, পাকিস্তান বা ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না, বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















