লিড
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পাল্টা হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। একই বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রাশিয়ার একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে জরুরি বৈঠক
বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাহরাইনের নেতৃত্বে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব পাস হয়, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। এই ভোটাভুটির সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনী টানা দ্বাদশ দিনের মতো ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল।

জাতিসংঘে বাহরাইনের প্রতিনিধি জামাল ফারেস আলরোয়াইয়েই বৈঠকে বলেন, তিনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখনও সাইরেন বাজছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের হামলায় এমন দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা ইরানের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। এতে সাধারণ মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
প্রস্তাবে ব্যাপক সমর্থন
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টি দেশ বাহরাইনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও ছিল। চীন ও রাশিয়া ভোটদানে বিরত থাকে।
এই প্রস্তাবটি ছয়টি উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছিল। সমর্থক দেশগুলো জানায়, মোট ১৩৫টি দেশ এই প্রস্তাবের সহপ্রস্তাবক হয়েছে, যা ইরানের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐক্যের বড় প্রমাণ।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কারণ এই পথটি বিশ্বে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, এবং সেখানে অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, “১৩৫টি দেশ আপনাদের পাশে রয়েছে।” তিনি ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে থাকা দেশগুলোর উদ্দেশে এ কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক ঐক্যই জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করে। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে জাতিসংঘের প্রতি এমন সমর্থনের মন্তব্যকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে।
ইরানের তীব্র সমালোচনা
জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত দুঃখজনক দিন” বলে আখ্যা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, পরিষদ তার দায়িত্বের অপব্যবহার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সভাপতির অবস্থান ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।

ইরাভানি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রই এই যুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১,৩৪৮ জন বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে, নিহত হয়েছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবকে তিনি ভণ্ডামি বলে উল্লেখ করেন।
রাশিয়ার প্রস্তাব ও তার পরিণতি
এই বৈঠকে রাশিয়া একটি পৃথক প্রস্তাব তোলে, যেখানে সংঘাত কমানো এবং যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। তবে ওই প্রস্তাবে সংঘাতের জন্য কোনো পক্ষকে দায়ী করা হয়নি।
জাতিসংঘে রাশিয়ার প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, তাদের প্রস্তাব ছিল সরল ও স্পষ্ট। এতে যুদ্ধ বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর ওপর হামলার নিন্দা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
রাশিয়ার এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় চারটি দেশ—রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও সোমালিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও লাটভিয়া এর বিরোধিতা করে। অন্যদিকে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, বাহরাইন, কলম্বিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডেনমার্ক, গ্রিস, লাইবেরিয়া ও পানামা ভোটদানে বিরত থাকে।
কিছু দেশ রাশিয়ার প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। তাদের মতে, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার এই প্রস্তাবের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
#জাতিসংঘ #নিরাপত্তা_পরিষদ #ইরান #মধ্যপ্রাচ্য_সংঘাত #হরমুজ_প্রণালী
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















