দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় ঝুঁকির আলোচনায় মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। কিন্তু নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণা দেখাচ্ছে, পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ নদী ডেল্টা অঞ্চলে সমুদ্রের পানি বাড়ার চেয়েও দ্রুতগতিতে ডুবে যাচ্ছে মাটি নিজেই। ফলে কোটি কোটি মানুষের বসতি ও অর্থনীতি এখন এক নতুন ধরনের জলবায়ু বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বহু নদী ডেল্টা অঞ্চলে জমি ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই নিম্নগমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত। এর ফলে নদী ও উপকূলের কাছাকাছি থাকা বড় শহরগুলোতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বের নদী ডেল্টায় বাড়ছে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি
উপগ্রহভিত্তিক রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর পৃষ্ঠের ক্ষুদ্র পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের নদী ডেল্টা অঞ্চলগুলোর অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় মাটি ক্রমাগত নিচে নামছে।
বিশ্বের মোট স্থলভাগের মাত্র এক শতাংশ জুড়ে নদী ডেল্টা অঞ্চল থাকলেও এখানে বাস করে প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ কোটি মানুষ। কৃষি উৎপাদন, বাণিজ্য এবং নগর উন্নয়নের দিক থেকে এসব অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো অত্যন্ত নাজুক ভূপ্রকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
গবেষণায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বের ৪০টি বড় নদী ডেল্টার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল বলছে, অন্তত ৩৫ শতাংশ ডেল্টা ভূমি বর্তমানে ধীরে ধীরে নিচে নামছে এবং অধিকাংশ ডেল্টায় অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় এই নিম্নগমন চলছে।

কেন ডুবে যাচ্ছে জমি
ডেল্টা অঞ্চল সাধারণত হাজার বছরের পলিমাটি জমে তৈরি হয়। এই পলি ও কাদামাটি ভেজা ও নরম হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ওজনেই কিছুটা বসে যায়। আগে নদীর নিয়মিত বন্যা নতুন পলি এনে এই ক্ষয় পূরণ করত।
কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বদলে দিয়েছে। বাঁধ, সেচব্যবস্থা এবং শহর সম্প্রসারণের কারণে নদীর পলি জমা হওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন। ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে নেওয়ার ফলে মাটির নিচের নরম স্তরগুলো চাপে সংকুচিত হয়ে যায় এবং জমি স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০টি ডেল্টার মধ্যে অন্তত ১০টিতে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারই ভূমি নিম্নগমনের প্রধান কারণ।
আমেরিকার উপকূলে ভাঙছে ভূমি
এই সমস্যার একটি বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীর ডেল্টা অঞ্চল। সেখানে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরো ডেল্টার ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ধীরে ধীরে নিচে নামছে। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩.৩ মিলিমিটার জমি নিচে নেমে যাচ্ছে, যদিও কিছু এলাকায় এই হার আরও বেশি।
শতাব্দীজুড়ে এই নিম্নগমন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় জলাভূমির বিশাল অংশ হারিয়ে গেছে। বহু স্থানে নিয়মিত বন্যা, বাঁধ নির্মাণ এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এশিয়ার বড় শহরগুলোর সামনে বড় সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও পানীয় জলের জন্য এখানে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়।
মেকং, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র, চাও প্রয়া এবং হলুদ নদীর ডেল্টা অঞ্চলের বড় অংশ এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত নিচে নামছে। কোথাও কোথাও বছরে এক সেন্টিমিটারেরও বেশি হারে জমি ডুবে যাচ্ছে।
এই ডেল্টাগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বড় শহরগুলোর কিছু, যেমন ব্যাংকক, ঢাকা এবং সাংহাই। ফলে ভবিষ্যতে বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে।

নীতিগত পদক্ষেপে কমতে পারে বিপদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার তুলনায় মানবসৃষ্ট ভূমি নিম্নগমন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে টোকিওর কথা উল্লেখ করা হয়। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে শহরের কিছু অংশ চার মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। পরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প পানির উৎস তৈরি করার ফলে এই নিম্নগমন দ্রুত কমে আসে।
ডেল্টা অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত বন্যা ঘটিয়ে পলি জমার সুযোগ দেওয়া, বাঁধ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমানোর মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করতে পারে।
জলবায়ু পরিকল্পনায় অবহেলিত এক বড় সংকট
গবেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণে ভূমি নিম্নগমনকে দীর্ঘদিন ধরে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এই সমস্যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। একবার জমি নিচে নেমে গেলে তা আবার ওপরে তোলা সম্ভব নয়। ফলে ভবিষ্যতে অনেক অঞ্চলের মানুষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যেমন অন্যত্র সরে যাওয়া বা বসতি স্থানান্তর করা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই সংকট মোকাবিলার প্রথম ধাপ হলো সমস্যাটিকে স্বীকার করা এবং দ্রুত নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















