ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক ফোঁটা তেলও যেতে দেবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপসাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
সংঘাতের নতুন পর্যায়ে সৌদি আরব, ওমান ও বাহরাইনসহ উপসাগরের বিভিন্ন দেশে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করতে হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির দিকে ছোড়া হয়েছিল এবং আরেকটি পূর্বাঞ্চলের দিকে আসার সময় প্রতিহত করা হয়।
একই সময়ে শায়বাহ তেলক্ষেত্রের দিকে আসা পাঁচটি ড্রোনও ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া আল খার্জ, হাফার আল বাতিন ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আরও এগারোটি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়।
ওমান জানিয়েছে, দুকুম বন্দরের কাছে একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে এবং আরেকটি সমুদ্রে পড়ে গেছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় জরুরি সাইরেন বেজে ওঠার পর একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্তত চারটি বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাল্টা হামলার ফল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিমান সরিয়ে নেওয়া ও আকাশপথে সতর্কতা
নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা তাদের কিছু উড়োজাহাজ দেশ থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছে। আঞ্চলিক আকাশপথ অল্প সময়ের জন্য খুলে দেওয়ার সুযোগে প্রায় দশটি উড়োজাহাজ প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি অব্যাহত থাকায় বাহরাইন থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান চলাচল কার্যত স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বিকল্প বিমানবন্দর থেকে সীমিত সংখ্যক প্রত্যাবাসন ফ্লাইট পরিচালনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হরমুজ প্রণালীতে কঠোর হুঁশিয়ারি
সংঘাতের মাঝেই ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে কড়া সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজ কিংবা সংশ্লিষ্ট যে কোনো জাহাজকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক ফোঁটা তেলও যেতে দেওয়া হবে না। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। ফলে এ পথে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরানের ভেতরে চলমান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবেই এসব পাল্টা আক্রমণ চলছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় বিশ হাজার নাগরিককে ইতোমধ্যে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তখন কয়েক লাখ ফরাসি নাগরিক অবস্থান করছিল।
নতুন নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ইঙ্গিত
সংঘাতের মধ্যে ইউরোপীয় জোট ইরানের উনিশজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা জড়িত।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কতদিন চলবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তাদের ভাষ্য, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















