০৫:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ রেস্তোরাঁ খাত বাঁচাতে কর কমানো ও গ্যাস সংযোগ চালুর দাবি হাওরে ভেজা ধান নিয়ে কৃষকের কান্না, মিলছে না ক্রেতা বা সরকারি সহায়তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল সংকট সীমান্তে, না অবিশ্বাসে? জ্বালানি সংকটে সংযমের আহ্বান মোদির, আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর বিজয়ের উত্থান, কংগ্রেসের সংকট এবং ভারতের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ জাহানারা ইমাম: এক মায়ের শোক থেকে জাতির বিবেক হয়ে ওঠার গল্প টিকের কামড়ে বাড়ছে ঝুঁকি, যুক্তরাষ্ট্রে ছড়াচ্ছে ছয় বিপজ্জনক রোগ ১৯২৬ সালের ব্রিটিশ সাধারণ ধর্মঘট: শ্রমিকদের হার, না কি শাসকশ্রেণির নৈতিক পরাজয়? মা: ভালোবাসার প্রথম ঠিকানা

বোমা, ভয় আর ভাঙা স্বপ্নের মাঝখানে ইরান: মুক্তির আশা নাকি ধ্বংসের অন্ধকার?

তেহরানের আকাশে রাতের অন্ধকার হঠাৎ আগুনে আলোকিত হয়ে উঠছে, আর ভোরের আলো ঢেকে যাচ্ছে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায়। যুদ্ধের সেই দৃশ্য এখন ইরানের লাখো মানুষের জীবনে ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

দেশটির কোটি মানুষের সামনে এখন দুই ভয়ংকর বাস্তবতা—একদিকে বিদেশি বোমা হামলা, অন্যদিকে ক্ষমতা ধরে রাখতে দৃঢ় শাসকগোষ্ঠীর কঠোর হুমকি। এই দুই শক্তির মাঝখানে আটকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

বোমা হামলায় বদলে গেছে তেহরানের আকাশ

তেহরানের এক বাসিন্দা আরিয়ান প্রথমদিকে মনে করেছিলেন, এই হামলাই হয়তো দীর্ঘদিনের কঠোর শাসনের অবসান ঘটাবে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আশার জায়গা দখল করেছে আতঙ্ক।

রাতের আকাশে বিস্ফোরণের আলো আর দিনের আলোকে ঢেকে দেওয়া কালো ধোঁয়ার দৃশ্য তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বেশি ভয়ংকর।

Two people on scorched ground, one kneeling by boxes, the other standing and holding a red hose. A burned tanker truck and other large vehicles are in the background.

তার ভাষায়, চারদিকে শুধু বিস্ফোরণ আর আগুন। রাত যেন দিনে পরিণত হচ্ছে, আবার সকাল ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। এই দৃশ্য অনেকের মতো তাকেও হতাশ করে তুলেছে।

৯ কোটির বেশি মানুষের অনিশ্চিত জীবন

ইরানের প্রায় ৯ কোটির বেশি মানুষ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। বিদেশি হামলায় দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, আবার শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা ধরে রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট আগে থেকেই মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। তার ওপর যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো সমাজকে আরও ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত করে তুলেছে।

গত বছরের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে এই সংঘাত শুরু হয়েছে। এর আগে দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

A person in dark clothing works high on a utility pole. Dense, dark gray smoke fills the background.

নেতৃত্বের পরিবর্তন ও কঠোর সতর্কতা

সাম্প্রতিক হামলায় দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর পর ক্ষমতার ভার যায় তার ছেলের হাতে। নতুন নেতৃত্ব আসার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রচারে জানানো হয়েছে, কেউ যদি আন্দোলন বা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে, তাকে শত্রুর সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এই পরিস্থিতিতে শহরের রাস্তায় বাড়ছে তল্লাশি চৌকি। অনেক মানুষের মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে সরকারপন্থী সমাবেশে যোগ দিতে বলা হচ্ছে এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে জানাতে বলা হচ্ছে।

ইন্টারনেট বন্ধ, বাড়ছে বিভ্রান্তি

যুদ্ধের সময় অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিজের দেশেই কী ঘটছে তা বুঝতে পারছে না।

অনেকে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না। আবার বিদেশি সংবাদকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন। এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।

Fear and hope for Iranians trapped between bombs and defiant rulers -  PressReader

বিস্ফোরণ, ধোঁয়া আর আতঙ্কের শহর

সাম্প্রতিক হামলায় তেহরানের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আকাশে উঠেছে ঘন কালো ধোঁয়া, অনেক জায়গায় তেলের মতো কালো বৃষ্টি পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

একজন ব্যবসায়ী জানান, একদিন হঠাৎ মহাসড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখে অনেক চালক বিপরীত দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দেন। পরে জানা যায়, সেখানে নতুন তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষ ভেবেছিল বোমা পড়তে যাচ্ছে।

আশার আলো নাকি ধ্বংসের ভয়

এই পরিস্থিতিতেও কিছু মানুষ মনে করেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু প্রান্তিক অঞ্চলে এমন আশা দেখা যাচ্ছে।

Anthropic and AI's Oppenheimer Moment: How Israel-US Are Blurring Ethical  Lines in Iran War - The Wire

তবে অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তনের মূল্য খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে।

তেহরানের এক উদ্যোক্তা বলেন, যদি পুলিশ স্টেশন, নিরাপত্তা বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশ কীভাবে চলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন কেউ দিতে পারছে না।

তার মতে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠান দরকার। কিন্তু যুদ্ধ সেই ভিত্তিগুলোকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

আজ ইরানের অনেক মানুষের মনে একই প্রশ্ন ঘুরছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই মুক্তির পথ খুলে দেবে, নাকি দেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে?

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ

বোমা, ভয় আর ভাঙা স্বপ্নের মাঝখানে ইরান: মুক্তির আশা নাকি ধ্বংসের অন্ধকার?

০৫:৫১:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

তেহরানের আকাশে রাতের অন্ধকার হঠাৎ আগুনে আলোকিত হয়ে উঠছে, আর ভোরের আলো ঢেকে যাচ্ছে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায়। যুদ্ধের সেই দৃশ্য এখন ইরানের লাখো মানুষের জীবনে ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

দেশটির কোটি মানুষের সামনে এখন দুই ভয়ংকর বাস্তবতা—একদিকে বিদেশি বোমা হামলা, অন্যদিকে ক্ষমতা ধরে রাখতে দৃঢ় শাসকগোষ্ঠীর কঠোর হুমকি। এই দুই শক্তির মাঝখানে আটকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

বোমা হামলায় বদলে গেছে তেহরানের আকাশ

তেহরানের এক বাসিন্দা আরিয়ান প্রথমদিকে মনে করেছিলেন, এই হামলাই হয়তো দীর্ঘদিনের কঠোর শাসনের অবসান ঘটাবে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই আশার জায়গা দখল করেছে আতঙ্ক।

রাতের আকাশে বিস্ফোরণের আলো আর দিনের আলোকে ঢেকে দেওয়া কালো ধোঁয়ার দৃশ্য তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বেশি ভয়ংকর।

Two people on scorched ground, one kneeling by boxes, the other standing and holding a red hose. A burned tanker truck and other large vehicles are in the background.

তার ভাষায়, চারদিকে শুধু বিস্ফোরণ আর আগুন। রাত যেন দিনে পরিণত হচ্ছে, আবার সকাল ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। এই দৃশ্য অনেকের মতো তাকেও হতাশ করে তুলেছে।

৯ কোটির বেশি মানুষের অনিশ্চিত জীবন

ইরানের প্রায় ৯ কোটির বেশি মানুষ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। বিদেশি হামলায় দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, আবার শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা ধরে রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট আগে থেকেই মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। তার ওপর যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো সমাজকে আরও ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত করে তুলেছে।

গত বছরের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে এই সংঘাত শুরু হয়েছে। এর আগে দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

A person in dark clothing works high on a utility pole. Dense, dark gray smoke fills the background.

নেতৃত্বের পরিবর্তন ও কঠোর সতর্কতা

সাম্প্রতিক হামলায় দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর পর ক্ষমতার ভার যায় তার ছেলের হাতে। নতুন নেতৃত্ব আসার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রচারে জানানো হয়েছে, কেউ যদি আন্দোলন বা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে, তাকে শত্রুর সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এই পরিস্থিতিতে শহরের রাস্তায় বাড়ছে তল্লাশি চৌকি। অনেক মানুষের মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে সরকারপন্থী সমাবেশে যোগ দিতে বলা হচ্ছে এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে জানাতে বলা হচ্ছে।

ইন্টারনেট বন্ধ, বাড়ছে বিভ্রান্তি

যুদ্ধের সময় অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ নিজের দেশেই কী ঘটছে তা বুঝতে পারছে না।

অনেকে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না। আবার বিদেশি সংবাদকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন। এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।

Fear and hope for Iranians trapped between bombs and defiant rulers -  PressReader

বিস্ফোরণ, ধোঁয়া আর আতঙ্কের শহর

সাম্প্রতিক হামলায় তেহরানের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আকাশে উঠেছে ঘন কালো ধোঁয়া, অনেক জায়গায় তেলের মতো কালো বৃষ্টি পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

একজন ব্যবসায়ী জানান, একদিন হঠাৎ মহাসড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখে অনেক চালক বিপরীত দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দেন। পরে জানা যায়, সেখানে নতুন তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষ ভেবেছিল বোমা পড়তে যাচ্ছে।

আশার আলো নাকি ধ্বংসের ভয়

এই পরিস্থিতিতেও কিছু মানুষ মনে করেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু প্রান্তিক অঞ্চলে এমন আশা দেখা যাচ্ছে।

Anthropic and AI's Oppenheimer Moment: How Israel-US Are Blurring Ethical  Lines in Iran War - The Wire

তবে অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তনের মূল্য খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে।

তেহরানের এক উদ্যোক্তা বলেন, যদি পুলিশ স্টেশন, নিরাপত্তা বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশ কীভাবে চলবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন কেউ দিতে পারছে না।

তার মতে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠান দরকার। কিন্তু যুদ্ধ সেই ভিত্তিগুলোকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

আজ ইরানের অনেক মানুষের মনে একই প্রশ্ন ঘুরছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই মুক্তির পথ খুলে দেবে, নাকি দেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে?