যুক্তরাষ্ট্রে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরির নতুন পরিকল্পনা এগোতে গিয়ে অদ্ভুত এক সমস্যার মুখে পড়েছে—এলিভেটর বা লিফট সংক্রান্ত কঠোর নিয়ম। শহরগুলোতে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যয়বহুল লিফট নীতিমালা অনেক প্রকল্পকে থামিয়ে দিচ্ছে। ফলে বাড়ির সরবরাহ কমছে, আর বাড়িভাড়া ও দাম আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু আবাসন বাজারকেই চাপে ফেলছে না, বরং চলাচলে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বাসস্থানের সুযোগও সীমিত করে দিচ্ছে।
মাঝারি ঘনত্বের আবাসন বাড়ানোর উদ্যোগ
গত বছরের শেষে সিয়াটল সিটি কাউন্সিল শহরের আবাসিক এলাকায় চারতলা পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্ট ভবন তৈরির অনুমতি দেয়। এর আগে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় ম্যাসাচুসেটসের ক্যামব্রিজ শহর। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন আইনে এক জমিতে সর্বোচ্চ দশটি আবাসন ইউনিট তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের নীতির লক্ষ্য হচ্ছে তথাকথিত ‘মাঝারি ঘনত্বের আবাসন’ তৈরি করা। অর্থাৎ একক পরিবারের বাড়ির তুলনায় বেশি মানুষ থাকতে পারে এমন ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বা টাউনহাউস, যেগুলো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
তবে বাস্তবে এই ভবনগুলোর বেশিরভাগই লিফটবিহীন সিঁড়িভিত্তিক ভবন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

লিফট না থাকায় বাড়ছে সমস্যা
গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে লিফট বসানো খুবই ব্যয়বহুল। ফলে নির্মাতারা সাধারণত চারতলা বা তিনতলা ভবন তৈরি করলেও সেখানে লিফট বসাতে চান না।
ফলে সেসব ভবনে বসবাস করতে গেলে প্রতিদিন কয়েকবার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। অনেক বাসিন্দার জন্য এটি অসুবিধাজনক, আর চলাচলে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে চলাচলে প্রতিবন্ধী প্রায় তিন কোটি মানুষের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য বাসস্থান বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য। মোট আবাসনের ছয় শতাংশেরও কম এমনভাবে নির্মিত যাতে তারা সহজে থাকতে পারেন।
অন্য দেশগুলোর তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি
ইউরোপের অনেক দেশে তিন বা চারতলা ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে সাধারণত ছোট আকারের লিফট বসানো হয়। এমনকি অনেক সময় আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নির্মাতারা স্বেচ্ছায় লিফট বসান।
ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশে একটি ছোট ভবনের লিফট বসাতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার সমমূল্যের খরচ হয় এবং জায়গাও লাগে খুব কম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের লিফট বসাতে খরচ হতে পারে প্রায় বিশ লাখ টাকার সমপরিমাণ, এবং জায়গাও লাগে দ্বিগুণের বেশি।
এই বিশাল ব্যয় অনেক নির্মাণ প্রকল্পকে আর্থিকভাবে অসম্ভব করে তোলে।
পুরোনো আইনের অপ্রত্যাশিত প্রভাব
১৯৮৮ সালের একটি আবাসন সংশোধনী আইন মূলত বাসস্থানে প্রবেশগম্যতা বাড়ানোর জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, সেই আইনের কিছু নিয়ম ছোট ভবনে লিফট বসানোকে আরও কঠিন করে তুলছে।
আইনে বলা হয়েছে, চারটি বা তার বেশি অ্যাপার্টমেন্ট থাকলে সেখানে এমন প্রবেশপথ থাকতে হবে যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সহজে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু লিফটের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম আকার এত বড় রাখা হয়েছে যে ছোট ভবনে তা বসানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য দেশে লিফটের বোতাম পাশের দেয়ালে বসানো হয়, ফলে বড় ঘোরার জায়গা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পুরোনো মানদণ্ডের কারণে লিফটের আকার অযথা বড় হয়ে গেছে।

সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষা
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ইতিমধ্যে এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। কিছু রাজ্য লিফট সংক্রান্ত নিয়ম পুনর্বিবেচনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আবাসন ও নগর উন্নয়ন বিভাগ যদি লিফটের আকার ও মানদণ্ড বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দেয়, তাহলে ছোট ভবনে ছোট আকারের লিফট বসানো সহজ হবে। এতে নির্মাতারা লিফট বসাতে আগ্রহী হবেন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বাসস্থানও আরও সহজলভ্য হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিবর্তন একদিকে আবাসনের খরচ কমাতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে প্রবেশগম্যতা বাড়াবে—যা একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















