ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা হামলার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। বহু বছর ধরে সক্রিয় একটি ওয়েবসাইট, যেখানে শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ছবি প্রকাশিত হতো, সেই স্কুলই যুদ্ধের প্রথম দিনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। হামলায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
শিশুদের ছবি ও স্বপ্নে ভরা ছিল স্কুলের ওয়েবসাইট
মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ নামের এই মেয়েদের স্কুলটির একটি সক্রিয় ওয়েবসাইট ছিল। সেখানে শিক্ষার্থীদের আঁকা রঙিন ছবি, স্কুলের মাঠে খেলা এবং শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনার নানা মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করা হতো। একই রঙের পোশাক পরা ছোট ছোট মেয়েদের দলবদ্ধ ছবি সেই ওয়েবসাইটে দেখা যায়।
সংরক্ষিত অনলাইন তথ্য ও পুরোনো সংস্করণ থেকে জানা যায়, অন্তত কয়েক বছর ধরে এই স্কুলের কার্যক্রম নিয়মিত চলছিল। স্যাটেলাইট ছবিতেও স্কুলের মাঠ ও খেলার দাগ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

হামলার দিন ধ্বংস হয়ে যায় পুরো ভবন
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই এই স্কুল ভবনে সরাসরি হামলা হয়। স্কুলটি একটি সামরিক ঘাঁটির পাশেই অবস্থিত ছিল এবং একই এলাকায় অন্তত সাতটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের ফলে পুরো ভবন ধ্বংস হয়ে যায়।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই হামলায় প্রায় ১৭৫ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ জন ছিল স্কুলের ছাত্রী। পরে শহরের কবরস্থানে এক সারিতে তাদের কবর দেওয়া হয়।
স্যাটেলাইট ছবিতে বিস্ফোরণের স্পষ্ট চিহ্ন
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৩২৫ মিটার এলাকাজুড়ে একাধিক বিস্ফোরণের চিহ্ন রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্কুল ভবন, ছাদের বড় গর্ত এবং পুরোপুরি ধসে পড়া একটি ভবনের চিত্রও দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, এই হামলায় সমুদ্রপথ থেকে ছোড়া দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজেও বিস্ফোরণের মুহূর্তে বড় ধোঁয়ার মেঘ উঠতে দেখা যায়।

পুরোনো লক্ষ্যতথ্যের কারণে ভুল হামলার সন্দেহ
এই ঘটনাকে ঘিরে সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে প্রস্তুত করা লক্ষ্যতালিকা হয়তো দীর্ঘদিন আপডেট করা হয়নি। ফলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে হামলা পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়মিত পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে বেসামরিক স্থাপনা ভুলবশত হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
সামরিক ঘাঁটির পাশেই ছিল স্কুল
এই স্কুলটি একটি সামরিক ইউনিটের ঘাঁটির খুব কাছেই অবস্থিত ছিল। একটি দেয়াল দিয়ে স্কুল এলাকা ঘাঁটি থেকে আলাদা করা ছিল। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, অন্তত ২০১৮ সাল থেকে এটি একটি স্কুল হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছিল।
হামলার কয়েক মাস আগেও স্কুল প্রাঙ্গণে মানুষের উপস্থিতি স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছিল। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত শিক্ষাক্রম চলছিল।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো শিক্ষার স্বপ্ন
ওয়েবসাইটে স্কুলটির একটি স্লোগান ছিল—আজ আমি শিখি, আগামীকাল আমরা গড়ি। কিন্তু যুদ্ধের এক হামলায় সেই ভবনই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যেখানে একসময় শিশুদের হাসি আর পড়াশোনার শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ আর অসংখ্য অকালপ্রয়াত শিক্ষার্থীর স্মৃতি।






সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















