মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ দুই সপ্তাহের দোরগোড়ায় পৌঁছাতেই সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা একের পর এক কঠোর বার্তা দিচ্ছেন। পাল্টাপাল্টি হামলায় ইতিমধ্যে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও শেয়ারবাজারেও।
প্রতিশোধের অঙ্গীকার নতুন ইরানি নেতার
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রথমবারের মতো বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তিনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তাদের ভূখণ্ডে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ না করলে সেগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের শুরুতে হওয়া হামলায় তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন। তাই তিনি সরাসরি প্রকাশ্যে না এসে বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন।

ইসরায়েলের পাল্টা হুঁশিয়ারি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের নতুন নেতাকে লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পতন দেশের ভেতর থেকেই ঘটতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে পুরো শক্তি দিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডারের কথা উল্লেখ করে জানান, এই সংঘাতে তাদের সময় ও শক্তির কোনো অভাব নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এই যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। বিরোধী রাজনীতিকরা অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধের মানবিক ক্ষতি নিয়ে প্রশাসন যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিশেষ করে ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে।

নতুন করে হামলা ও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, গত একদিনে পশ্চিম ও মধ্য ইরানের দুই শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র তৈরির স্থাপনা।
অন্যদিকে ইরান রাতের আঁধারে ইসরায়েলের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। উত্তর ইসরায়েলে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, যদিও অধিকাংশই সামান্য আঘাত পেয়েছেন।
লেবানন ও উপসাগরজুড়ে উত্তেজনা
এই যুদ্ধ লেবাননেও বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করেছে। সেখানে ইসরায়েলের হামলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ড্রোন হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানেও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।

তেলের বাজারে বড় ধাক্কা
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম প্রায় নয় শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা গেছে এবং এশিয়ার বাজারগুলোতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরানের ভেতরে বাড়ছে নিরাপত্তা উপস্থিতি
ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে কম বের হচ্ছে, যদিও বাজার ও দোকানপাট এখনও খোলা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছে। তবে দেশটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর এখনো বড় ধরনের সংগঠিত আন্দোলনের লক্ষণ দেখা যায়নি।
মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে দুই হাজার ছাড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরানে। এই সংঘাত আরও দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















