ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি পড়তে শুরু করেছে ভারতের অর্থনীতি ও ব্যবসায়। ব্যাহত জাহাজ চলাচল, বেড়ে যাওয়া জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বিখ্যাত বাসমতি চালের রপ্তানি আটকে পড়েছে, বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে এবং অনেক রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সংঘাতের ১৩তম দিনে এসে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মুখে পড়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে যদি এই সংঘাত ও জাহাজ চলাচলের বাধা দীর্ঘস্থায়ী হয়। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। ২০২৫ সালে দেশের তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ৮৯ শতাংশ সরবরাহও এই পথ দিয়ে এসেছে।
সোমবার রাতে ভারত সরকার জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাতে গৃহস্থালি ব্যবহার ও গাড়ির জ্বালানির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। ভারতে বহু যানবাহন সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে।
ইমকে গ্লোবালের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা বলেন, “সমস্যা এখন শুধু দামের নয়, সরবরাহেরও।”
গুজরাটের সিরামিক শিল্পে উৎপাদন থমকে যাওয়ার আশঙ্কা
গ্যাসের সংকট ভারতের সিরামিক শিল্পকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। গুজরাটে অবস্থিত এই শিল্পে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সিরামিক উৎপাদন হয়, যার বেশিরভাগই মোরবি শহরে কেন্দ্রীভূত। শহরটিতে প্রায় ৭০০টি কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০টি কারখানা সিরামিক ভাটিতে আগুন জ্বালাতে প্রোপেন গ্যাস ব্যবহার করে।
মোরবি সিরামিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোজ আরভাদিয়া জানান, ইতিমধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে শহরের প্রায় একশোটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আগামী ১০ দিনের মধ্যে যদি প্রোপেন সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তাহলে আমাদের সব কারখানাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”

রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে সংকট
গ্যাসের সংকট শুধু শিল্পে নয়, সেবা খাতেও প্রভাব ফেলছে। বড় বড় শহরের অনেক রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং হোটেল শিল্প থেকেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভারতের হোটেল ও রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয় শেঠি জানান, মুম্বাইয়ের প্রায় ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও হোটেল ইতিমধ্যেই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যদি তরল গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকে, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, মহারাষ্ট্রজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন যে রেস্তোরাঁগুলো জ্বালানি বাঁচাতে মেনু সীমিত করছে, কাজের সময় কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। ন্যাশনাল রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, এক দিনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে এই খাতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ বিলিয়ন রুপি ক্ষতি হতে পারে।
টেক্সটাইল শিল্পে বাড়তি খরচ
এদিকে জাহাজ পরিবহন ব্যয় ও অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে টেক্সটাইল শিল্পও চাপে পড়েছে। ইউরোপমুখী রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতি কনটেইনার পরিবহন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতি কনটেইনারে প্রায় ২২০০ থেকে ২৩০০ ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ৩০০০ ডলারের বেশি হয়েছে।
কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান অশ্বিন চন্দ্রন জানান, অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পলিয়েস্টারের দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, “পলিয়েস্টার ব্যবহারকারী শিল্পগুলো বড় ধাক্কা খাচ্ছে, কারণ স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে হঠাৎ দাম বাড়ার চাপ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।”
তেলের দামে অস্থিরতা
গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম তীব্র ওঠানামা করেছে। সোমবার দাম প্রায় ১২০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছায়, মঙ্গলবার নেমে আসে প্রায় ৮৩ দশমিক ৫০ ডলারে, এরপর বৃহস্পতিবার আবার প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও ইরানের পক্ষ থেকে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্নধর্মী বার্তা আসার কারণে বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত তেলের দাম প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামাল ব্যবহারকারী শিল্প যেমন রং ও রাবার টায়ার উৎপাদন খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আইসিআইসিআই গবেষণার এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
রপ্তানিতে ধাক্কা
এই সংঘাত ভারতের রপ্তানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ তথ্য সংস্থা আইসিআরএ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ শতাংশ যায় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে। আসিয়ান দেশগুলোর তুলনায় এই নির্ভরতা অনেক বেশি, যেখানে পশ্চিম এশিয়ায় রপ্তানি মোট রপ্তানির মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ।
ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি পণ্য বাসমতি চাল। প্রতি বছর দেশটি প্রায় ৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন বাসমতি চাল রপ্তানি করে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ যায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে।
অল ইন্ডিয়া রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সতীশ গোয়েল জানান, বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ টন চাল সমুদ্রে আটকে আছে বা ভারতের বন্দরে জমে আছে। প্রতিটি টনের মূল্য প্রায় ১০০০ ডলার।

বিমান পরিবহনেও প্রভাব
ইরান ও আশপাশের অঞ্চলের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক বিমান দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেছে।
আইসিআরএ জানিয়েছে, ৫ মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলো ১৭০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে, যা তাদের মোট আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রায় ৪৬ শতাংশ।
এয়ার ইন্ডিয়া মঙ্গলবার জানায়, জেট জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটেই অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ আরোপ করবে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই চার্জ আরোপ না করলে কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে না, কারণ তখন পরিচালন ব্যয় মেটানো যাবে না।
বাজারেও চাপ
এই যুদ্ধের প্রভাব এমন সময়ে পড়েছে যখন ভারতের আর্থিক বাজার ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে।
চলতি বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে ৮৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং এখন ইরান সংঘাতের কারণে এই প্রবণতা আরও বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের আশঙ্কায় ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শেয়ারেও বড় পতন দেখা গেছে। চলতি বছরে প্রধান সূচক নিফটি ফিফটি প্রায় ৮ শতাংশ কমলেও বড় কোম্পানির শেয়ার এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ মূল্যে লেনদেন হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে নোমুরা ও মরগ্যান স্ট্যানলি।
জ্বালানি ও পরিবহন সংকটের পর মরগ্যান স্ট্যানলি ভারতের বিনিয়োগ রেটিং “অতিরিক্ত গুরুত্ব” থেকে কমিয়ে “সমান গুরুত্ব” করেছে। তাদের মতে, তেলের দামের ঝুঁকির সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিকভাবে নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মূল্যায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আবার ভারতের বাজারে বড় আকারে বিনিয়োগ করতে কিছুটা সময় নিতে পারেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















