মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেল যখন লেবাননের রাজধানী বৈরুতের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। লেবানন সরকারের প্রধান প্রশাসনিক ভবনের কাছাকাছি এলাকায় আঘাত হানায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়ে দিয়েছে, এই অভিযান স্বল্প সময়ের জন্য নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। এতে লেবাননজুড়ে মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৈরুতের হৃদয়ে বিস্ফোরণ
বৃহস্পতিবার বিকেলে বৈরুতের বাচৌরা এলাকায় একটি ভবনে বিমান হামলা চালানো হয়। এই স্থানটি লেবাননের সরকারি সদর দপ্তরের খুব কাছেই অবস্থিত। হামলার আগে ওই এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এর কিছু সময় পরই কাছাকাছি জুকাক আল-ব্লাত এলাকায় আরেকটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে বৈরুতের আরেকটি এলাকায় হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন। সেই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সমুদ্রতীরবর্তী একটি ফুটপাত, যেখানে বাস্তুচ্যুত বহু পরিবার তাঁবু গেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল।
বাস্তুচ্যুতদের একজন বলেন, ওই তাঁবুগুলোতে শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ ছিল। তবুও হামলা চালানো হয়েছে, যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর এবার আরও বিস্তৃত অঞ্চলের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছে ইসরায়েলি বাহিনী। নতুন নির্দেশে লেবাননের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা কার্যত খালি হয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী অভিযান আরও বিস্তৃত করবে।
দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত
ইসরায়েলি সেনাপ্রধান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, চলমান অভিযান দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রয়োজন হলে আরও সেনা ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করা হবে এবং উত্তর সীমান্তে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এই সংঘাতের সূচনা হয় মার্চের শুরুতে, যখন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালায়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে।
সাম্প্রতিক হামলায় হিজবুল্লাহ শতাধিক রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে ইসরায়েল দাবি করেছে। একই সময়ে ইরান থেকেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাড়ছে নিহতের সংখ্যা
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৬৮৭ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ৯৮ জন শিশু, ৬২ জন নারী এবং ১৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন।
অন্যদিকে সংঘাতের কারণে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে আট লক্ষাধিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
বেসামরিক মানুষের মূল্য খুব বেশি
জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, চলমান সংঘাতে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত বেশি হয়ে গেছে। তিনি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং সামনে আরও বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট বাড়তে পারে।

লেবাননকে সতর্কবার্তা
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লেবাননের রাষ্ট্রপতিকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের ওপর হামলা থেকে থামাতে না পারে, তবে ইসরায়েল নিজেই ওই এলাকাগুলো দখল করে ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে লেবানন সরকার ইতিমধ্যে জানিয়েছে, রাষ্ট্রের বাইরে কোনো সশস্ত্র কার্যক্রম মেনে নেওয়া হবে না। এ নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















