ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তবে তা শুধু ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের ভেতরে জাতিগত সংঘাতের মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পথ খুলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানে কুর্দি শক্তি ব্যবহারের আলোচনা
সাম্প্রতিক সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে শুধুমাত্র আকাশ হামলা দিয়ে এমন পরিবর্তন আনা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। সেই কারণেই ইরানের ভেতরে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার করে স্থলভাগে চাপ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় হামলার তীব্রতা বেড়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে, যেখানে ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে প্রবেশের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি
ইরানের কুর্দি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বঞ্চনা ও কঠোর দমননীতির মুখোমুখি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিহাস জুড়ে তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ইরানি কুর্দি ভিন্নমতাবলম্বী কয়েকটি সংগঠন প্রথমবারের মতো একত্রিত হয়ে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
এই গোষ্ঠীগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা যুদ্ধে অংশ নিতে পারে, তবে তার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। তাদের দাবি, আকাশপথে হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য একটি উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের ইরানে কুর্দিদের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
সম্ভাব্য লাভের আড়ালে বড় ঝুঁকি
প্রথম দৃষ্টিতে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল করতে পারে বলে মনে হতে পারে। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে কুর্দিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
তবে এই কৌশলের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সংঘাতে কুর্দিদের সমর্থন দেওয়ার পর হঠাৎ সেই সমর্থন প্রত্যাহারের উদাহরণও রয়েছে। ফলে কুর্দিদের স্বপ্ন ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে ইরানের সরকার যদি কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে তারা দূর থেকে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এতে ওই অঞ্চল আরও সহিংস সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
জাতিগত সংঘাতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, কুর্দি বিদ্রোহ শুরু হলে ইরানের অন্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হতে পারে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী অন্যান্য জনগোষ্ঠীও তখন নিজেদের স্বার্থে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরান ধীরে ধীরে একটি জাতিগত গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে এবং পুরো অঞ্চল নতুন সংকটে পড়তে পারে।

আঞ্চলিক মিত্রদের জন্যও সংকট
এই ধরনের পরিস্থিতি ইরাক ও তুরস্কের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে কুর্দি অধ্যুষিত ইরাকের অঞ্চলে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানে তেল উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র কুর্দি সংগঠনগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ইরানে কুর্দি বিদ্রোহ শুরু হলে তুরস্কও সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার স্বল্পমেয়াদে সামরিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
এমন পরিস্থিতি শুধু ইরানের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকেও নতুন করে বদলে দিতে পারে। তাই সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















