গত মাসে দ্বিতীয় মৌসুমে ফিরে আসা অ্যাপল টিভি সিরিজ ‘মনার্ক: লেগেসি অব মনস্টার্স’-এ অভিনয় করেছেন আনা সাওয়াই, তাইহিরো হিরা, রেন ওয়াতাবে ও কিয়ারসি ক্লেমনস। সিরিজটি একটি পরিবারের বহু প্রজন্মকে ঘিরে গড়ে ওঠা গল্প, যারা ভয়ংকর দানবদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
‘মনার্ক: লেগেসি অব মনস্টার্স’-এর অভিনেতারা বলছেন, গডজিলার জন্মভূমি জাপানে শুটিং করার অভিজ্ঞতা সিরিজটির গুরুত্ব ও গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সময়ের ভিন্ন বাস্তবতা
এই সিরিজে সময়ের প্রবাহ কিছুটা আলাদা। দ্বিতীয় মৌসুম শুরু হয় ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই, যেখানে প্রথম মৌসুমের ক্লিফহ্যাঙ্গার শেষ হয়েছিল। তবে বাস্তবে — এবং কিছু চরিত্রের জীবনে — এর মধ্যে কেটে গেছে দুই বছর।
এই সময়ের ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কেন্টারো র্যান্ডা চরিত্রে, যাকে অভিনয় করেছেন রেন ওয়াতাবে। আনা সাওয়াইয়ের কেট র্যান্ডা এবং কিয়ারসি ক্লেমনসের মে ওলোয়ে-হিউইট এক রহস্যময় মধ্যবর্তী জগতে আটকে থাকলেও কেন্টারো এই দুই বছর পৃথিবীতে কাটিয়েছে। সেই সময় তাকে আরও পরিণত করেছে, পরিবারের টানাপোড়েন মোকাবিলা করা এবং সম্ভাব্য নতুন দানব হামলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছে।
ওয়াতাবের কাছে এই সময়ের পরিবর্তন চরিত্রটিকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, এই সময়ের ব্যবধানে কেন্টারো আরও অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে এবং এখন সে অনেক বেশি স্বনির্ভর। চরিত্রটির সেই পরিবর্তন ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি।
মনস্টারভার্সের বিস্তৃত গল্প
হলিউডের ক্রমবর্ধমান ‘মনস্টারভার্স’-এর অংশ এই সিরিজ। ২০১৪ সালের গডজিলা চলচ্চিত্রের ঘটনার পরবর্তী সময়ে গল্পটি এগোয়। এখানে দেখা যায়, রহস্যময় সংগঠন ‘মনার্ক’-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েক প্রজন্মের কাইজু শিকারিদের।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৎ ভাইবোন কেট ও কেন্টারো। তাদের পিতা হিরোশি র্যান্ডা (তাকেহিরো হিরা) মৃত্যুবরণ করেছেন বলে ধারণা করার পর তারা প্রথম একে অপরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর তারা জড়িয়ে পড়ে মনার্কের অভিযানে।
তারা তাদের বাবা, দাদি (মারি ইয়ামামতো) এবং বন্ধুদের সঙ্গে মিলে রহস্যময় টাইটান এক্সকে থামানোর চেষ্টা করে, যাতে গডজিলাকে তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসতে না হয়।
সম্পর্কের টানাপোড়েন
দানবদের তাণ্ডব আর বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত কাহিনির মধ্যেও সিরিজটির আসল শক্তি মানুষের সম্পর্ক।
নতুন মৌসুমে কেট ও কেন্টারোর সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। বদলে যাওয়া আনুগত্য এবং পুরোনো ক্ষোভ সেই সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলে।
আনা সাওয়াই বলেন, কেটের মনে বাবাকে নিয়ে কেন্টারোর প্রতি কিছুটা ঈর্ষা কাজ করে।
কেট দীর্ঘ সময় দূরে থাকার কারণে বাবার সঙ্গে সম্পর্কের যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি, কেন্টারো সেই সুযোগ পেয়েছিল। ফলে আবেগের ভারসাম্য বদলে গেছে।
সাওয়াই বলেন, কেন্টারো এই দুই বছর বাবার সঙ্গে সময় কাটিয়ে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে, কিন্তু কেট সেই সুযোগ পায়নি।
গল্পের চরিত্রদের মধ্যে জোট দ্রুত গড়ে ওঠে আবার ভেঙেও যায়। প্রত্যেকেই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে।
সাওয়াই বলেন, প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন আলাদা। এই নতুন মৌসুম জুড়ে সেই সম্পর্কগুলোর ওপর কঠিন পরীক্ষা আসে, আর সময়ের ব্যবধান সেই পরিবর্তনকে আরও গভীর করে তোলে।

ওয়াতাবের ক্যারিয়ারের নতুন মোড়
রেন ওয়াতাবের নিজের ক্যারিয়ারেও এই চরিত্রটি একটি বড় মোড় এনে দিয়েছে। কেন্টারো চরিত্রে অভিনয়ের আগে তিনি কেবল ২০২০ সালের চলচ্চিত্র ‘৪৬১ ডেজ অব বেনতো’-তে একটি সহায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
তবে নিজের উন্নতি ও চরিত্রের বিকাশের তুলনা করতে গিয়ে তিনি বিনয়ীই থাকেন। তার মতে, উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রটির ভেতরের পরিবর্তন এবং মানসিক পরিপক্বতা দেখানো।
জাপানে শুটিংয়ের বিশেষ গুরুত্ব
সিরিজটির আরেকটি বড় শক্তি এর বিস্তৃত পরিসর। মনস্টারভার্সের চলচ্চিত্রগুলোর মতোই এটি বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে ঘোরে। তবে গডজিলা চলচ্চিত্রের জন্মভূমি হওয়ায় জাপানে শুটিংয়ের গুরুত্ব আলাদা।
প্রথম মৌসুমের পর থেকে জাপানের চলচ্চিত্র শিল্প আন্তর্জাতিক শুটিংয়ের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন শহরে শুটিং সহজ করার নীতি, লোকেশন প্রণোদনা এবং বিদেশি প্রযোজনার সংখ্যা বাড়ায় দেশটি নির্মাতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ওয়াতাবে বলেন, এখন প্রযোজনার পরিসর আরও বড় হয়েছে। একটি দৃশ্যে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত শিল্পী ব্যবহার করতে হয়েছিল।
শিনজুকুতে ধারণ করা সেই দৃশ্যে গডজিলার দীর্ঘ উপস্থিতি রয়েছে।
ওয়াতাবে বলেন, সেই মুহূর্তটি তার কাছে খুবই স্মরণীয়, কারণ এতে দেখা গেছে জাপানি প্রযোজনা দলের সদস্যরা কতটা উৎসাহ ও আবেগ নিয়ে কাজ করছিলেন।
বাস্তব লোকেশনের অভিজ্ঞতা
কিয়ারসি ক্লেমনসের চরিত্র মে গল্পের বড় অংশ টোকিওতে কাটায়। বাস্তব লোকেশনে শুটিং তার অভিনয়ে বাড়তি বাস্তবতা এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, এতে মনে হয় যেন সত্যিই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিনয় করছেন। অনেক সময় মানুষ দৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ চলে আসত, আর সেটি তার কাছে দারুণ লেগেছে।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক প্রযোজনার জন্য জাপানকে কঠিন জায়গা বলে মনে করা হতো। তবে এই সিরিজের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে যে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।
সাওয়াই বলেন, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা এবং জাপানকে ধীরে ধীরে আরও সহজে শুটিং করা যায় এমন জায়গা হিসেবে গড়ে উঠতে দেখা ভালো লেগেছে।
ক্লেমনসও এতে একমত। তার মতে, জাপানের প্রযোজনা সম্প্রদায় এখন সেখানে কাজ আনতে আগ্রহী, বিশেষ করে এমন প্রকল্প যেগুলো সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গডজিলার হৃদয় এখানেই রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গল্পের সেতুবন্ধ
আনা সাওয়াই ইতিমধ্যেই জাপানি গল্প এবং আন্তর্জাতিক দর্শকের সংযোগস্থলে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। বহুজাতিক অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত বিভিন্ন সিরিজে তিনি কাজ করেছেন।
২০২৪ সালে এফএক্স-এর ‘শোগুন’ সিরিজে অভিনয়ের জন্য তিনি এমি পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পান। এছাড়া তিনি অ্যাপল টিভির আরেক জনপ্রিয় নাটক ‘পাচিনকো’-তেও অভিনয় করেছেন।
সাওয়াইয়ের মতে, ‘মনার্ক: লেগেসি অব মনস্টার্স’ও মূলত একটি আন্তর্জাতিক গল্প। জাপানে কাজ করার সময় দলের সদস্যরাও ছিলেন বিভিন্ন দেশের।
তিনি বলেন, কেন্টারো চরিত্রটি যেখানে জাপানি সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরে, সেখানে কেটের চরিত্রে রয়েছে দ্বৈত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। কেট কেবল জাপানি নন, তিনি জাপানি-আমেরিকান।
গডজিলার বৈশ্বিক পরিচয়
গডজিলা নিজেও একইভাবে একটি সাংস্কৃতিক সংযোগস্থলের প্রতীক। ১৯৫৪ সালে তোহো স্টুডিও তৈরি করা এই বিশাল কাইজু দানব জাপানের জনপ্রিয় সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত, আবার একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক বিনোদন জগতেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
ওয়াতাবের মতে, এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মিশ্রণই সিরিজটিকে আলাদা করে তোলে।
তিনি বলেন, তার চরিত্রটি পুরোপুরি জাপানি পরিচয় বহন করে, যা একটি বড় হলিউড পরিসরের গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সিরিজে কার্ট রাসেল ও কিয়ারসি ক্লেমনসের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা আছেন, যা পুরো প্রকল্পটিকে অনন্য করে তুলেছে।
‘মনার্ক: লেগেসি অব মনস্টার্স’-এর দ্বিতীয় মৌসুমের নতুন পর্ব প্রতি শুক্রবার অ্যাপল টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে। মৌসুমের শেষ পর্ব সম্প্রচার হবে ১ মে।
গ্যাব্রিয়েলা গেইসিঙ্গার 



















