মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ শুধু সীমান্ত বা সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি আঘাত পড়ছে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে। উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বহু পাকিস্তানি শ্রমিকের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে যুদ্ধের ধাক্কায়। সাম্প্রতিক হামলায় দুবাইয়ে নিহত দুই পাকিস্তানি শ্রমিকের ঘটনা সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে।
দুবাইয়ে হামলায় প্রাণ হারালেন প্রবাসী শ্রমিক
পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে এখন শোকের ছায়া। সেখানে আত্মীয়স্বজনদের মাঝে বসে সান্ত্বনা নিচ্ছেন আবদুল মালিক। তাঁর ভাতিজা মুজাফফর আলি গত সপ্তাহে দুবাইয়ে নিহত হন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সী আলি ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক। মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যে প্রতিশোধমূলক হামলার সময় একটি প্রতিরোধ করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ তার গাড়ির ওপর পড়ে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
চার বছর আগে পরিবারকে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখাতে দুবাই পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত কফিনে ফিরে আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে এখন তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আরও প্রাণহানি, বাড়ছে উদ্বেগ
একই ঘটনায় নিহত হন আরেক পাকিস্তানি মুরিব জামান। ৪৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তি পাঁচ সন্তানের বাবা ছিলেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে চালকের কাজ করছিলেন।
এছাড়াও ইরানের জলসীমায় মাছ ধরার সময় একটি ড্রোন হামলায় আরেক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই ঘটনাগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা
উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা পাকিস্তানিদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় তিন থেকে পাঁচ শতাংশ আসে প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে।
বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিক উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে কর্মরত, যাদের বড় অংশই অদক্ষ শ্রমিক। এই অর্থ দিয়ে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ছোট ব্যবসার খরচ চলে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫.২ শতাংশ বেশি।
তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে চাপ পড়তে পারে এবং তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবাসী আয়ের ওপরও পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দেশে ফেরার বড় ঢল নেই
যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পাকিস্তানি শ্রমিকদের বড় আকারে দেশে ফেরার ঘটনা দেখা যায়নি। ইসলামাবাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফিরে আসা শ্রমিকের সংখ্যা এখনও খুবই কম।
তবু নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন নিরাপত্তা ও সহায়তার দাবি তুলছে।
মুজাফফর আলির পরিবার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তারা কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি। তাদের অভিযোগ, এত বড় বিপর্যয়ের পরও সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তেমন সহায়তা মেলেনি।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, যখন আলি দুবাই যাচ্ছিলেন তখন সবাই ভেবেছিল তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটিতে যাচ্ছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দেশ থেকেই তার মরদেহ ফিরে আসে।
যুদ্ধ থামানোর দাবি
নিহত শ্রমিকদের পরিবার বলছে, এই যুদ্ধের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও তারাই প্রাণ দিচ্ছে।
তাদের দাবি, দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা হোক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, যাতে নিরীহ মানুষ আর সংঘাতের বলি না হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















