মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ১৪তম দিনে যুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সামরিকভাবে কোনো পক্ষই স্পষ্ট বিজয়ের কাছাকাছি যেতে পারেনি, তবে সংঘাত ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এবং ইরানের কৌশলগত চাপ পুরো যুদ্ধের ভারসাম্যকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।
পশ্চিম ইরাকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ভূপাতিত
দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পশ্চিম ইরাকের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আকাশ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ভূপাতিত হওয়া। বিমানটি আকাশে অন্য যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করছিল। হামলায় বিমানটির চারজন ক্রু সদস্যই নিহত হন। একই আক্রমণে আরেকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।
ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন আকাশ সহায়তা ব্যবস্থার ওপর এটি সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উপসাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি
এদিকে ইরান তাদের “সত্য প্রতিশ্রুতি চার” অভিযানের অংশ হিসেবে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে পশ্চিম জেরুজালেম, তেল আবিব ও আইলাতসহ বিভিন্ন শহরের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের কয়েকটি সামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থিত পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতের আহমদ আল জাবের বিমানঘাঁটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটির ওপর হামলার কথা বলা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকজন মার্কিন ও মিত্র সেনা আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

তুরস্কে সতর্কতা, সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
দক্ষিণ তুরস্কের ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। যদিও সরাসরি আঘাতের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবু এই ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ তুরস্ক একটি ন্যাটো সদস্য দেশ। সেখানে সরাসরি হামলা হলে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনায় বিশ্ব তেলবাজারে চাপ
সমুদ্রপথে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। ইরান সমুদ্র মাইন, বিস্ফোরক ড্রোন এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মাধ্যমে এ পথ ব্যবহারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশ কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের প্রায় পনের শতাংশ তেল সরবরাহ এখন কার্যত প্রণালীর পূর্ব দিকে আটকে আছে। ফলে তেলের দাম আবারও একশ ডলারের উপরে উঠে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করেছে, যুদ্ধ বন্ধ হলেও স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরতে কয়েক সপ্তাহ কিংবা মাস লেগে যেতে পারে।

ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক স্থিতি
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল রয়েছে। তেহরানে সরকারপন্থী বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিও জোরদার করা হয়েছে।
যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার প্রস্তুতি রয়েছে ইরানের।

আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও সংঘাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। উত্তর ইরাকে একটি ড্রোন হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আভাস
ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা দেখালেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগের ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওমানের মাধ্যমে তেহরানের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে ইরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, চাপের মুখে তারা কোনো ছাড় দেবে না এবং দীর্ঘ সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন দ্রুত বিজয়ের লড়াই নয়, বরং সহনশীলতার পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। সামরিকভাবে স্পষ্ট জয় না পেলেও ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধের পরিবেশকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ কোনো কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী এবং অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















