হিমালয়ের কোলে অবস্থিত কাঠমান্ডু উপত্যকা থেকে দক্ষিণ–পূর্বের ঝাপা জেলায় পৌঁছানো সহজ কাজ নয়। প্রায় চারশ ত্রিশ কিলোমিটার পথ গাড়িতে পাড়ি দিতে সাধারণত দশ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। তবে রাজনীতির ময়দানে সেই দূরত্বই যেন এক নতুন ইতিহাসের পথ খুলে দিয়েছে। কারণ এই পথেই উঠে এসেছেন নেপালের নতুন রাজনৈতিক তারকা বালেন শাহ।
মাত্র দুই মাস আগেও তিনি ছিলেন কাঠমান্ডুর মেয়র। কিন্তু সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ঝাপা–৫ আসনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে তিনি এখন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সাবেক এই র্যাপার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছেন।
নির্বাচনে বিপুল জয়, পুরোনো রাজনীতির বড় ধাক্কা
পাঁচ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন শাহের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি নিম্নকক্ষের দুই শত পঁচাত্তর আসনের মধ্যে একশ তিরাশি আসনে জয় পেয়েছে। সুপার সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দলটি মাত্র একটি আসন দূরে।
ঝাপা–৫ আসনে বালেন শাহ মুখোমুখি হন চারবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির। সেখানেই তিনি বিপুল ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই ফলাফলকে বিশ্লেষকেরা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থানের স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

তরুণদের আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পথ
গত বছর নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে।
সেপ্টেম্বরের সেই আন্দোলন দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশের গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয় এবং সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান
গত দুই দশক ধরে নেপালের রাজনীতি মূলত তিনটি শক্তির হাতে ঘুরপাক খেয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি, মধ্যবাম নেপালি কংগ্রেস এবং একটি মাওবাদী দল পালাক্রমে সরকার গঠন করেছে।
কিন্তু এই সময়ে অর্থনৈতিক সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়েছে। যুব বেকারত্ব প্রায় বিশ শতাংশে স্থির থেকেছে। কাজের সন্ধানে লাখ লাখ তরুণ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। নেপালের গড় বয়স মাত্র ছাব্বিশ হওয়ায় তরুণদের অসন্তোষ দ্রুত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
/indian-express-bangla/media/media_files/2026/03/07/balen-2026-03-07-08-37-16.jpg)
দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি ও নতুন স্বপ্ন
বালেন শাহ জানিয়েছেন, তার প্রধান লক্ষ্য দুর্নীতি নির্মূল এবং কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা। ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালকে তিনি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
তিনি পাঁচ বছরের মধ্যে বারো লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হলেও ভোটারদের কাছে তা নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে মেয়র হিসেবে কাজ
দুই হাজার বাইশ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর শহরের পরিচ্ছন্নতা সমস্যা সমাধান এবং অবৈধ ব্যবসা উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে বালেন শাহ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তার এই কাজ তরুণদের পাশাপাশি বয়স্ক ভোটারদের মধ্যেও আস্থা তৈরি করেছে। অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মরত সন্তানদের কারণে কর্মসংস্থানের সংকট সরাসরি অনুভব করছে। ফলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা আরও তীব্র হয়েছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিপুল বিজয়ের সঙ্গে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। প্রথমত, জনগণের প্রত্যাশা এখন অত্যন্ত উচ্চ। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে বদলানো সহজ কাজ নয়।
দ্বিতীয়ত, বালেন শাহের নেতৃত্বের ধরন নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তিনি প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে খুব কম কথা বলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করেন।
তারপরও দীর্ঘ রাজনৈতিক হতাশার পর নেপালের মানুষ এখন নতুন এক আশার বাতাস অনুভব করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















