যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একসময় যাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেই লাতিনো ভোট এখন ধীরে ধীরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতছাড়া হচ্ছে। সীমান্তনীতি, গণহারে বহিষ্কার অভিযান এবং অর্থনৈতিক অসন্তোষ—এই তিন কারণে লাতিনো ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
সীমান্ত সংকট থেকে ট্রাম্পে আস্থা
টেক্সাসের ম্যাকঅ্যালেন শহরের নির্মাণ ব্যবসায়ী মারিও গুয়েরেরো দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের সমর্থক ছিলেন। টেলিভিশনের ব্যবসাভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখে বড় হওয়া এই উদ্যোক্তার বিশ্বাস ছিল, একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে ট্রাম্প অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন।
বিশেষ করে সীমান্ত সংকট তাকে ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকতে সাহায্য করে। তার বাড়ির কাছের সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার অভিবাসী নদী পেরিয়ে আসতে দেখে তিনি পরিস্থিতিকে মানবিক সংকট হিসেবে দেখেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প যখন অপরাধীদের বহিষ্কারের কথা বলেছিলেন, তখন সেটিকে তিনি শক্ত অবস্থান হিসেবে সমর্থন করেছিলেন।
কিন্তু এখন তার মতে বাস্তবে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, এখন শুধু অপরাধী নয়, প্রায় সবাইকেই ধরপাকড় করা হচ্ছে।

নির্মাণশিল্পে বড় ধাক্কা
দক্ষিণ টেক্সাসজুড়ে অভিবাসন তল্লাশি বাড়ায় নির্মাণশিল্পে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। ঠিকাদার রেনে পেরেজের মতে, লাতিনো শ্রমিকেরা এখন বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। ফলে নির্মাণকাজ শেষ করতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে।
কিছু ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ চলাকালীনই শ্রমিকদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একেকটি প্রকল্পে শুরুতেই কয়েক হাজার ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অনেক ঠিকাদার।
নির্বাচনে লাতিনো সমর্থনের উত্থান
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প লাতিনো ভোটে বড় সাফল্য পেয়েছিলেন। এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে ৩৬ শতাংশ লাতিনো ভোটার তাকে সমর্থন করেছিলেন, ২০২৪ সালে সেই হার বেড়ে হয় ৪৮ শতাংশ।
বিশেষ করে টেক্সাসের সীমান্তবর্তী অনেক জেলায় লাতিনো ভোটাররা রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সে সময় রিপাবলিকানরা দাবি করেছিলেন, লাতিনো ভোটাররা তাদের দলে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন।

দ্রুত বদলে যাচ্ছে জনমত
তবে এক বছরের মধ্যেই সেই সমর্থন কমে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, লাতিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমেছে। অনেকেই এখন তার অভিবাসন নীতির তীব্র সমালোচনা করছেন।
কিছু ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ফেডারেল বাহিনীর সহিংস অভিযানের দৃশ্য অনেক লাতিনো নাগরিককে ক্ষুব্ধ করেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, লাতিনোদের বড় অংশ এখন অভিবাসন দপ্তর বিলুপ্ত করার পক্ষেও মত দিচ্ছেন।
অর্থনীতি নিয়েও হতাশা
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও লাতিনো ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন নির্বাচনের সময় ট্রাম্প দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে বাজারদর বেড়েই চলেছে।
কিছু অর্থনৈতিক নীতি, বিশেষ করে শুল্ক আরোপ এবং বিদেশনীতি ঘিরে উত্তেজনা—এসবও বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। অনেকের মতে, আগের তুলনায় একই টাকায় এখন বাজারের অর্ধেক জিনিসও কেনা যাচ্ছে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, লাতিনো ভোটারদের এই পরিবর্তিত মনোভাব আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। টেক্সাসসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আসন পুনর্বিন্যাসের সময় রিপাবলিকানরা ধরে নিয়েছিলেন যে লাতিনো সমর্থন আগের মতোই থাকবে।
কিন্তু নতুন জরিপে দেখা যাচ্ছে, অনেক লাতিনো ভোটার এখন ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের একাধিক আসনে ফলাফল পাল্টে যেতে পারে।
তবু রিপাবলিকানদের কিছু শক্তি রয়ে গেছে
তারপরও রিপাবলিকানদের কিছু সুবিধা এখনো রয়েছে। ট্রাম্পের অনুগত একদল সমর্থক মনে করেন তার প্রশাসন সফলভাবেই কাজ করছে।
এছাড়া সামাজিক বিষয়েও কিছু লাতিনো ভোটার রিপাবলিকানদের সঙ্গে বেশি একমত। অনেকের মতে, ডেমোক্র্যাটরা সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবু সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, একসময়ের শক্তিশালী সমর্থন এখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সমর্থন বদলের ইঙ্গিত
মারিও গুয়েরেরোর মতো অনেক ভোটারই এখন মত বদলানোর কথা ভাবছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করতে পারেন।
আরেক ঠিকাদার রেনে পেরেজ ভোট দিতে না পারলেও তার স্ত্রী, যিনি আগের নির্বাচনে ভোট দেননি, এবার ভোট দিয়ে বর্তমান নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেবেন বলে জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















