ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির তৎপরতা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে সন্দেহভাজন অপরাধীদের শনাক্ত করতে জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিষয়টি ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে—অপরাধ দমনের দায়িত্ব যদি জনগণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঝুঁকি কি আরও বাড়বে?
অপরাধী শনাক্তে জনগণের সহায়তা চায় পুলিশ
সম্প্রতি রাজধানীর একটি বাস টার্মিনালে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের নিয়ে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক সভায় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিনতাইকারী ও মলম পার্টির সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে তাদের শনাক্ত করতে শ্রমিকদের সহযোগিতা কামনা করেন। অপরাধীদের তথ্য দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
তবে এই আহ্বানকে ঘিরে সামাজিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, অপরাধী ধরার দায়িত্ব যদি সাধারণ মানুষের ওপর বেশি নির্ভর করে, তাহলে পরিস্থিতি কখনও কখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা
আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধ এবং ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের প্রধান কাজ।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় ছিনতাই বা প্রতারণার ঘটনায় স্থানীয় জনগণই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সন্দেহভাজন কাউকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। আবার কিছু ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটে। কখনও কখনও সেই গণপিটুনির ফলেই মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বাড়ছে গণপিটুনির ঘটনা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুরি, ছিনতাই বা শিশুচুরির গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির বহু ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরে জানা গেছে, যাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তিনি প্রকৃত অপরাধী ছিলেন না।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই গণপিটুনির অন্তত উনত্রিশটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একুশজন। তার আগের মাসেও একই ধরনের বহু ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থার ঘাটতি এবং তাৎক্ষণিক ক্ষোভ—এই তিন কারণেই এমন ঘটনা বেশি ঘটে।

ঈদ মৌসুমে সক্রিয় অপরাধ চক্র
ঈদের সময় বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন ও ব্যস্ত বাজার এলাকায় মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে খাবারে নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে অজ্ঞান করা কিংবা শরীরে মলম লাগিয়ে অচেতন করে টাকা-পয়সা লুটে নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করে এসব চক্র।
অনেক যাত্রীর অভিযোগ, এসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়।
আইনের শাসন ও জনতার ভূমিকা
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যখন মানুষ মনে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারছে না, তখন অনেকেই নিজেরাই তাৎক্ষণিক বিচার করতে চায়। এতে একদিকে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষও সন্দেহের বশে হামলার শিকার হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, কাউকে অপরাধী প্রমাণ করার ক্ষমতা আদালতের। পুলিশ তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। সাধারণ মানুষ সন্দেহভাজন কাউকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারে, কিন্তু মারধর বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার তাদের নেই।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো, বাসস্ট্যান্ড ও স্টেশনগুলোতে নজরদারি জোরদার করা, নজরদারি যন্ত্র স্থাপন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা হলে অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, জনগণকে অপরাধী ধরতে বলা হয়নি। বরং সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে গোপনে শনাক্ত করতে সহায়তা করার জন্যই তাদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















