মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাজার পুনরায় সচল হবে কি না—তার চাবিকাঠি এখন মূলত ইরানের হাতেই রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, এপ্রিল মাসে তারা কোন বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নয়। এই ঘোষণাই বর্তমান সংকটের বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
অর্থাৎ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে এখন যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ইরানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বিশ্ব সরবরাহে বড় ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান উপসাগরীয় বিভিন্ন বন্দর ও তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
এক সৌদি তেল ক্রেতা আরামকোর চিঠি পাওয়ার পর মন্তব্য করেন, “যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা জানতে হয়তো ইরানকেই ফোন করতে হবে, তবেই বুঝব কখন তেল পাব।”
যুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণে ইরানের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক মহলের অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেকোনো সময় যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাত কতদিন চলবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নের একটি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ভিত্তিতে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০২২ সালের আগের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শিপিং কার্যত স্থবির
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে ওই পথে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক নৌবাহিনীর সহায়তা দিতে পারে এবং মিত্র দেশগুলোকেও যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে জ্বালানি শিল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল সামরিক নিরাপত্তা দিলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। ইরান যদি জাহাজ চলাচলে হামলা বা হুমকি বন্ধের নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে ট্যাংকার চলাচল পুনরায় শুরু করা কঠিন হবে।
এক উপসাগরীয় জ্বালানি শিল্প কর্মকর্তা বলেন, “ইরান নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আমাদের ট্যাংকারগুলো চলাচল করবে না।”
নতুন হামলা ও উত্তেজনার বিস্তার
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন কোনো শর্তে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে যা ইরান মেনে না নেয়, তাহলে তেহরান আরও হামলা চালিয়ে নিজেদের পরাজিত নয়—এটি প্রমাণ করতে চাইতে পারে।
ইতোমধ্যে ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল রপ্তানি কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খার্গ দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যেখানে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই হামলার মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে যে এই সংঘাতে কোনো নিরাপদ এলাকা নেই এবং পরিস্থিতি কীভাবে বাড়বে তা ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
এছাড়া ইয়েমেন, ইরাকসহ বিভিন্ন স্থানে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রক্সি হামলার সম্ভাবনাও বাড়ছে।
বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যদি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে হামলা চালায়, তাহলে সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় আস্থার সংকট
সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহের পথ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে।
এক ইরাকি সরকারি জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বন্দর, তেলক্ষেত্র ও শোধনাগার মেরামত করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এদিকে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তেল পরিবহনের বিমা পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে এবং খরচও বাড়ছে।
তেল উৎপাদনে বড় পতন
সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সৌদি আরবের বড় দুটি অফশোর তেলক্ষেত্র সাফানিয়া ও জুলুফে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ওপেকের সবচেয়ে বড় উৎপাদক সৌদি আরবের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরাকে তেল উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। আর তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক সংযুক্ত আরব আমিরাতে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন কমে গেছে, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বে মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। কাতার তাদের গ্রাহকদের জানিয়েছে, মে মাসের আগে তারা গ্যাস সরবরাহ করতে নাও পারতে পারে।
জ্বালানি খাতের এক সূত্র বলেন, “বিষয়টি খুবই সহজ—এটি নিরাপত্তার প্রশ্ন। মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা সম্ভব নয়।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















