হলিউডের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র পুরস্কার অস্কারে এবার সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ডার্ক কমেডি থ্রিলার ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। ব্যতিক্রমধর্মী গল্পের এই সিনেমা মোট ছয়টি অস্কার জিতে রাতের অন্যতম বড় বিজয়ী হিসেবে উঠে আসে।
অস্কারের মঞ্চে অপ্রচলিত গল্পের জয়
রবিবার লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সেরা ছবির সম্মান পায়। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন পল থমাস অ্যান্ডারসন।
অনুষ্ঠানে পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে অ্যান্ডারসন বলেন, এটি তার জন্য অবিশ্বাস্য এক মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে বহু মনোনয়ন পেলেও এবারই প্রথম অস্কার জয়ের স্বাদ পেলেন তিনি।
এই ছবিতে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। গল্পে তিনি একজন সাবেক বিপ্লবীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি পরে গাঁজা সেবনকারী একক বাবা হিসেবে কিশোর সন্তানের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই চলচ্চিত্রের জন্য পল থমাস অ্যান্ডারসন তিনটি বড় পুরস্কার জিতেছেন—সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক এবং সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্য।
চিত্রনাট্যের পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি বলেন, এই পৃথিবীকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে যাওয়ার জন্য সন্তানদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার অনুভূতি থেকেই তিনি সিনেমাটি লিখেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন প্রজন্ম ভবিষ্যতে পৃথিবীতে বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতা ফিরিয়ে আনবে।
শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ‘সিনার্স’
অস্কারের দৌড়ে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ভ্যাম্পায়ার-ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘সিনার্স’। প্রায় শতবর্ষের অস্কার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬টি মনোনয়ন নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেছিল এই সিনেমা।
শেষ পর্যন্ত চারটি পুরস্কার জেতে ‘সিনার্স’। এর মধ্যে অন্যতম সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান মাইকেল বি. জর্ডান। তিনি ছবিতে যমজ ভাই স্মোক এবং স্ট্যাক—এই দুই চরিত্রে অভিনয় করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবৈষম্যের যুগকে পটভূমি করে নির্মিত এই সিনেমায় ব্লুজ সংগীত এবং কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির উদযাপন দেখানো হয়েছে, যার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত উপাদানও যুক্ত করা হয়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের সময় জর্ডান বলেন, তিনি সেইসব শিল্পীদের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা তার আগে পথ তৈরি করেছেন। তিনি সিডনি পোয়েটিয়ার, ডেনজেল ওয়াশিংটন এবং হ্যালি বেরির মতো কিংবদন্তিদের নাম উল্লেখ করেন।
এই সিনেমার জন্য সিনেমাটোগ্রাফিতে পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েন অটাম ডুরাল্ড আরকাপাও। তিনি এই বিভাগে প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে অস্কার জয় করেন।
অভিনয়ে বড় চমক
সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান আইরিশ অভিনেত্রী জেসি বাকলি। তিনি ‘হ্যামনেট’ সিনেমায় উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটিতে তাদের ১১ বছরের ছেলে হ্যামনেটের মৃত্যুর পর দম্পতির মানসিক সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের সময় বাকলি বলেন, এই সম্মান তিনি একজন মায়ের হৃদয়ের জটিল আবেগকে উৎসর্গ করতে চান।
সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান শন পেন। ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবিতে তিনি এক আবেগপ্রবণ সামরিক কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এটি তার তৃতীয় অস্কার হলেও তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।
অন্যদিকে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন ৭৫ বছর বয়সী অ্যামি ম্যাডিগান। ‘উইপনস’ নামের ভৌতিক চলচ্চিত্রে অদ্ভুত স্বভাবের আন্ট গ্ল্যাডিস চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি এই সম্মান পান। প্রথম মনোনয়নের চার দশক পর তার হাতে ওঠে অস্কার।
অ্যানিমেশন বিভাগে বিশ্বজয়ী ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’
নেটফ্লিক্স প্রযোজিত ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’ সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই ছবির গান ‘গোল্ডেন’ সেরা মৌলিক গানের পুরস্কারও অর্জন করে।
বিশেষ শ্রদ্ধা দুই কিংবদন্তিকে
অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র জগতের দুই বড় ব্যক্তিত্ব—রবার্ট রেডফোর্ড এবং রব রেইনারের মৃত্যুতে বিশেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
রব রেইনারের স্মরণে বক্তব্য রাখেন অভিনেতা বিলি ক্রিস্টাল। তিনি বলেন, ‘এ ফিউ গুড মেন’ এবং ‘দিস ইজ স্পাইনাল ট্যাপ’-এর মতো সিনেমা বহু প্রজন্ম ধরে দর্শকদের মনে থাকবে।
মঞ্চে তার সঙ্গে যোগ দেন ডেমি মুর, মেগ রায়ানসহ রেইনারের চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অন্যান্য তারকারা।
অন্যদিকে রবার্ট রেডফোর্ডকে স্মরণ করেন বারব্রা স্ট্রেইস্যান্ড। তিনি তাকে এক অসাধারণ ও সংযত অভিনেতা এবং চিন্তাশীল শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেন। শেষে তিনি ‘দ্য ওয়ে উই ওয়ার’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গানের কয়েকটি লাইন গেয়ে শোনান।
আন্তর্জাতিক বিভাগে নরওয়ের সাফল্য
সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। পরিচালক জোয়াকিম ট্রিয়ারের এই চলচ্চিত্রটি নরওয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই বিভাগে অস্কার জয়ের গৌরব এনে দেয়।
হাস্যরস আর উদ্বেগের মিশ্রণ
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কনান ও’ব্রায়েন। তিনি উদ্বোধনী বক্তব্যে রসিকতা করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন অনেক চাকরি দখল করে নিচ্ছে, তখন নিজেকে শেষ মানব উপস্থাপক হিসেবে দেখতে পেয়ে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন।
তবে জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠান ঘিরে কিছু উদ্বেগও ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্ভাব্য হুমকির সতর্কতা জারি হওয়ায় অস্কারের অনুষ্ঠানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হলিউডের ভেতরের অনিশ্চয়তা
অস্কারের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেও চলচ্চিত্র শিল্পে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর ছাড় এবং কম খরচের কারণে অনেক স্টুডিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্য বা বিদেশে সিনেমা নির্মাণ করছে, যার ফলে হলিউডের ঐতিহ্যগত প্রভাব কিছুটা দুর্বল হচ্ছে।
এদিকে রাতের সবচেয়ে বড় বিজয়ী স্টুডিও ছিল ওয়ার্নার ব্রাদার্স, যারা মোট ১১টি অস্কার জিতেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের কাছে বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই একীভবনের বিরোধিতা করে একটি গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা হলিউডে বিলবোর্ড প্রচারও চালায়।
উল্লেখ্য, প্রায় ১০ হাজার অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের ভোটে অস্কারের বিজয়ীরা নির্ধারিত হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















