ঈদকে সামনে রেখে লালমনিরহাট সীমান্তে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মাদক চোরাচালান। দীর্ঘদিন ধরে চলা কঠোর অভিযান ও ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সীমান্তঘেঁষা এই জেলায় মাদক চক্রের বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সীমান্তের ফাঁক গলে বাড়ছে মাদকের প্রবাহ
লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার প্রায় ২৮১ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে রয়েছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। কোথাও বেড়া নেই, আবার কোথাও দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে মাদক ঢুকিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের অন্ধকারে এমনকি বেড়াবেষ্টিত এলাকাতেও মাদক ঢুকছে নির্বিঘ্নে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও এলাকাবাসী জানায়, ভারতীয় মদ, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক নিয়মিত প্রবেশ করছে। সীমান্ত পার হওয়ার পর এসব মাদক প্রথমে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে অস্থায়ী আস্তানায় রাখা হয়, পরে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সীমান্ত গ্রামগুলোতে মাদকের হাট
সীমান্তের অনেক গ্রামেই এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। চায়ের দোকান, রাস্তার মোড়, এমনকি রেলস্টেশনেও গোপনে চলে বেচাকেনা। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় বাইরের লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়, যা পুরো পরিবেশকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অল্প কয়েকজন চিহ্নিত কারবারিই পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
নিরাপদ রুট ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক
আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকা এখন মাদক চোরাচালানের প্রধান করিডোর হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারতীয় মদের চালান এসব পথেই বেশি আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কালীগঞ্জের গোরল ইউনিয়নে তদন্তকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও চক্রগুলো ভাঙা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, একাধিক মামলার আসামি হয়েও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনও এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও মাদক বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানে সাময়িক সাফল্য, আবারও উত্থান
সরকার পরিবর্তনের পর কিছু সময়ের জন্য অভিযান জোরদার হলে মাদক প্রবাহ কিছুটা কমেছিল। তবে ঈদের আগে আবারও তা বেড়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে জেলায় ২০টি মামলায় ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও চক্রের ওপর এর প্রভাব সীমিতই থেকে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, শক্তিশালী এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। ধারাবাহিক ও কঠোর প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
আইনের দুর্বল প্রয়োগে বাড়ছে ঝুঁকি
শিক্ষক ও সচেতন মহলের দাবি, অনেক সময় অভিযুক্তরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে জামিনে বেরিয়ে আবারও আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অপরাধের চক্র ভাঙা যাচ্ছে না।
সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মাদক যে তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে, সে বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জুমার খুতবায়ও এ বিষয়ে আলোচনা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনকালীন দায়িত্বের কারণে কিছুটা শিথিলতা এলেও এখন আবারও জোরদার করা হয়েছে অভিযান। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দিনরাত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস করা হবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















