ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ, পরিবার আর মিলনমেলা—এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় হাজারো দিনমজুর, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিকের কাছে এই দিনটি ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তাদের জন্য ঈদ মানে উৎসব নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।
জীবিকার টানে পরিবার থেকে দূরে
ঈদের সকালে যখন অনেকে নামাজ শেষে নতুন পোশাকে আনন্দে মেতে ওঠেন, তখনই অনেক শ্রমজীবী মানুষ কাজে বেরিয়ে পড়েন। তাদের দিন শুরু হয় না উৎসব দিয়ে, বরং পরিবারের জন্য উপার্জনের তাগিদে।
গাবতলীসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ঈদের দিনেও থেমে থাকে না কাজ। চালক, সহকারী ও টিকিট বিক্রেতারা ব্যস্ত থাকেন যাত্রী পরিবহনে। অনেকেই বছরের পর বছর বাড়ি যেতে পারেন না, কারণ বাড়ি গেলে আয় বন্ধ হয়ে যায়।
রিকশাচালকদের নীরব ত্যাগ
ঢাকার রাস্তায় ঈদের দিন কিছুটা ফাঁকা থাকলেও চলাচলের জন্য রিকশার চাহিদা থাকে। এই সুযোগে অনেক রিকশাচালক বাড়ি না গিয়ে শহরেই থেকে যান।
অনেকেই পরিবারকে টাকা পাঠিয়ে দেন, যাতে সন্তানরা নতুন পোশাক ও ভালো খাবার পায়। ফোনে কথা বলেই তারা সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করেন। তবে অন্তরে থেকে যায় না-পাওয়ার বেদনা।
দিনমজুরদের কঠিন বাস্তবতা
নির্মাণ শ্রমিক ও খণ্ডকালীন দিনমজুরদের অবস্থা আরও কঠিন। ঈদের সময় অনেক কাজ বন্ধ থাকায় তাদের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিকল্প কাজ খোঁজেন, আবার কেউ অপেক্ষা করেন ছোটখাটো কাজের আশায়।
অনেকের জন্য বাড়ি যাওয়া মানে অতিরিক্ত খরচ, যা ঈদের পর বেঁচে থাকার জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই তারা শহরেই থেকে যান, যদিও মন পড়ে থাকে পরিবারের কাছে।
আবেগের দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতা
ঈদ পরিবারকে ঘিরেই আনন্দের উৎসব। কিন্তু যারা দূরে থাকেন, তাদের জন্য এটি হয়ে ওঠে আবেগের এক কঠিন সময়। মোবাইল ফোন ও অর্থ পাঠানো কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও, প্রিয়জনদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার অভাব পূরণ হয় না।
শহরের চাকা সচল রাখার দায়িত্ব
পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ঈদ বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়গুলোর একটি। বাজার সচল রাখতে পণ্য পরিবহন, যাত্রী বহন—সবকিছুই চালু রাখতে হয়। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা ব্যক্তিগত আনন্দ ত্যাগ করেন।
নীরব ঈদ, তবু দায়বদ্ধতা
বাড্ডা, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নআয়ের শ্রমজীবীরা ছোট ছোট দলে ঈদ কাটান। কেউ মিলে রান্না করেন, কেউ ভাগাভাগি করে খান। কিছু সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিত্র দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নেই ছুটির নিশ্চয়তা। ফলে উৎসবের দিনেও তাদের বেছে নিতে হয় আয় আর পরিবারের মধ্যে একটিকে।
তবু আশার আলো
সব কষ্টের মাঝেও এই মানুষগুলো পরিবারের জন্য দায়িত্ববোধে অটুট থাকেন। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে নিজের সুখ নয়, বরং দূরে থাকা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
দেশজুড়ে যখন সন্ধ্যায় পরিবারগুলো একসঙ্গে খাবারে বসে, তখন ঢাকার অনেক শ্রমজীবী মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যান। তাদের ঈদ নীরব, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, ত্যাগ আর আশার গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















