মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিক অসংগতি ও নাটকীয় পরিবর্তন। একদিকে তিনি ইরানের সঙ্গে “গঠনমূলক আলোচনা” হওয়ার দাবি করছেন, অন্যদিকে ইরান সেই দাবি সরাসরি অস্বীকার করে তাকে উপহাস করছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ট্রাম্পের বক্তব্য, সামরিক পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
আলোচনার দাবি, কিন্তু ইরানের অস্বীকৃতি
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি ও ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে এবং দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি এমনকি পাঁচ দিনের মধ্যে চুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেন। কিন্তু ইরান এই দাবি নাকচ করে জানায়, কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। বরং তারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে পশ্চাদপসরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
হুমকি স্থগিত, অবস্থান পরিবর্তন

এর আগে ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এবং না হলে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কথা বলেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি সেই হুমকি পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেন। এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে তিনি আলোচনার “সুর ও পরিবেশ” উল্লেখ করেন, যা ইরানের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
বিরোধপূর্ণ সামরিক দাবি
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি একাধিকবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে যুদ্ধে জিতে গেছে। আবার পরবর্তী বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন, ইরান এখনও হামলা চালাতে সক্ষম। এই দ্বৈত বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হরমুজ প্রণালী ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তেলের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ায়। শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই পথ খোলা রাখছে, পরে আবার অন্য দেশগুলোর সাহায্য চান, আবার পরে বলেন কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই—এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও বিভ্রান্তিকর করে তোলে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা হামলা
ইরান জানায়, তারা যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। একই সঙ্গে তারা পারস্য উপসাগর অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
প্রশাসনের ভেতরে মতবিরোধ
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও এই নীতিগত অসঙ্গতি নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি নয় এবং এই যুদ্ধ মূলত ইসরায়েলের চাপেই শুরু হয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হবে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট নেতারা অভিযোগ করছেন, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। এমনকি একটি স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তের দাবিও উঠেছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে।
একই ধাঁচের পুনরাবৃত্তি
পুরো পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের একটি নির্দিষ্ট ধরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমে তিনি ইরানের সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি করেন, পরে স্বীকার করেন ইরান এখনও সক্ষম, তারপর আবার আগের দাবিতে ফিরে যান। এই চক্রাকার বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক বিভ্রান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
#ট্রাম্প #ইরানসংকট #মধ্যপ্রাচ্য #যুক্তরাষ্ট্রনীতি #হরমুজপ্রণালী #বিশ্বরাজনীতি
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















