লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা আবারও দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সংঘাত ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইসরায়েল হয়তো এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে জড়িয়ে পড়ছে, যার শেষ সহজে দেখা যাচ্ছে না।
সীমান্তে নতুন করে সংঘর্ষের শুরু
ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর শ্লোমিতে সাইরেন বাজতেই শোনা যায় ড্রোনের শব্দ, তারপর বিস্ফোরণ। এই ড্রোনগুলো ছুড়ছে লেবাননের শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ, যারা এখনো ইরানের সমর্থনে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিটি হামলা সফল হচ্ছে কিনা, নাকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো ভূপাতিত করছে—তা স্পষ্ট নয়।
প্রায় এক মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর থেকেই হিজবুল্লাহ আবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে বিমান হামলা চালায় এবং দক্ষিণাঞ্চলে সীমিত স্থল অভিযান শুরু করে।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকট
এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ লেবাননি ঘরছাড়া হয়েছে—যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণাঞ্চল ও বৈরুতের উপশহরের শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই পরিস্থিতি ২০২৩ সালের অক্টোবরের যুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তবে এবার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে—তখন ইসরায়েল সীমান্ত এলাকা থেকে নিজেদের নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু এবার তারা তা করতে রাজি নয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, তারা চায় না সীমান্তের জনপদগুলো স্থায়ীভাবে “ড্রোন আতঙ্কে” বসবাস করুক।
দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি দখলের আশঙ্কা
বর্তমানে ইসরায়েলের কৌশল আরও কঠোর বলে মনে হচ্ছে। দেশটির নেতারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, সেনাবাহিনী লিতানি নদী পর্যন্ত একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে। এতে লেবাননের প্রায় দশভাগ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে।
যদিও সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এমন নির্দেশ পাওয়ার কথা অস্বীকার করছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি অন্য কিছু ইঙ্গিত করছে। লিতানি নদীর ওপর থাকা আটটি সেতুতে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল কার্যত দক্ষিণ লেবাননকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
লেবাননের অভ্যন্তরে বিভাজন ও রাজনৈতিক চাপ
নতুন করে দখলের আশঙ্কা লেবাননের ভেতরে গভীর বিভাজন তৈরি করছে। বৈরুতের অ-শিয়া এলাকাগুলো এখন শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে অনিচ্ছুক, কারণ এতে নতুন করে ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সরকারও বিভক্ত। একদিকে তারা হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
সম্প্রতি লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বৈরুতের দিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। সেনাবাহিনী বলছে, যুদ্ধবিরতি ছাড়া তারা বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন আবার বাড়ার আশঙ্কা
ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক অভিযান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। একসময় “প্রতিরোধ শক্তি” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া হিজবুল্লাহ এখন অনেকের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু নতুন হামলায় যত বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে এবং দখলের আশঙ্কা যত বাড়ছে, ততই বিশেষ করে শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন বাড়তে পারে।
এর ফলে সরকার হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শঙ্কা
সীমান্তের দুই পাশের সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এক জায়গায় এসে মিলে—ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, লেবাননে যে সংঘাত আবার জ্বলে উঠেছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে, অঞ্চলটি আবারও একটি দীর্ঘ ও জটিল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















