মধ্যপ্রাচ্য থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এই জ্বালানি বহু দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের প্রধান ভিত্তি।
হরমুজ প্রণালীর অবরোধ এবং কাতারের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় বারবার হামলার ফলে এ বছর বাজার থেকে প্রায় ২৮ মিলিয়ন টন সরবরাহ কমে গেছে। এটি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সরবরাহ বৃদ্ধির প্রায় পুরো অংশের সমান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এশিয়ায় আসন্ন সংকট
এখন পর্যন্ত পারস্য উপসাগর থেকে আগে রওনা হওয়া জাহাজগুলোর কারণে এশিয়া কিছুটা সুরক্ষিত ছিল। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই জাহাজগুলোর শেষ চালান পৌঁছে যাবে। এরপরই সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদিত এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়া আমদানি করে। এই ঘাটতি অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত পুরোপুরি কাটবে না, যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন সরবরাহ আসার কথা।
চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড—সব দেশই বিদ্যুতের জন্য এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। এই হঠাৎ বিঘ্ন তাদের শিল্প উৎপাদনে বড় আঘাত হানতে পারে।
জ্বালানি পরিবর্তনের প্রবণতা
সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক দেশ বিকল্প হিসেবে কয়লা ও তেলের দিকে ঝুঁকছে। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি সাময়িকভাবে পূরণ করতে পারবে। জাপানও গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশ ঘাটতি কয়লার মাধ্যমে পূরণ করতে সক্ষম হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, কারণ কয়লা গ্যাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। তবুও শিল্প টিকিয়ে রাখতে দেশগুলো এই পথে এগোচ্ছে।
ভারত ইতিমধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এপ্রিল থেকে তিন মাস সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তাদের নিজস্ব কয়লার বিশাল মজুদ, রাশিয়া থেকে পাইপলাইনে গ্যাস এবং উন্নত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা রয়েছে।
সীমিত বিকল্পের দেশগুলো
তাইওয়ানের মতো কিছু দেশের বিকল্প কম। তারা কাতারের ওপর নির্ভরশীল এবং কয়লা ও পারমাণবিক শক্তি কমিয়ে ফেলেছে। ফলে সংকট মোকাবিলা করা তাদের জন্য কঠিন হবে।
অন্যদিকে, ধনী দেশগুলো উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে পারবে। কিন্তু এতে দরিদ্র দেশগুলো আরও সমস্যায় পড়বে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংকট
পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ অনেক দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাদের সামনে দুটি পথ—উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানি করা অথবা ব্যবহার কমিয়ে অর্থনীতি ধীর করে দেওয়া।
শিল্পখাতে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কাঁচ, ইস্পাত ও সিরামিক শিল্প গ্যাসনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
ভারত ও পাকিস্তানে গ্যাস সংকটে রান্নার জ্বালানিও কমে গেছে, ফলে লাখো মানুষ সমস্যায় পড়েছে এবং বহু ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ
অনেক দেশ জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং শুরু করেছে। ফিলিপাইনে কাজের সময় কমানো হয়েছে, পাকিস্তানে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। ভারতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে আবাসিক খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে শিল্প বিনিয়োগ বেড়েছে। গ্যাস সংকট এই প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
এই সংকট ভবিষ্যতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করতে পারে। গত পাঁচ বছরে এটি দ্বিতীয় বড় গ্যাস সংকট, যা জ্বালানিটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এলএনজি আগে পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য ‘সেতু জ্বালানি’ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক দেশ বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে।
এই সংকটের ফলে নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যুদ্ধ শেষ হলেও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সহজ হবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















