০৭:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের দাবী: তিন দিনে তিনটি আমেরিকার সামরিক বিমান ধ্বংস করেছে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল খাতে হামলা বাড়ানোর হুমকি ইসরায়েলের ইরানের ভেতরে দুঃসাহসিক অভিযানে মার্কিন পাইলট উদ্ধার, যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত ভারতের ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ পরিকল্পনার অভিযোগ, কড়া সতর্কবার্তা পাকিস্তানের ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রণালি খুলছে না- মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য চীন জেট ফুয়েল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে, বিশ্বব্যাপী বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট কমাচ্ছে বিদেশ থেকে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা নারীদের নিজ দেশে সাফ্যলের গল্প এপস্টাইন ফাইলে শক্তিশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মার্কিন বিচার বিভাগ কোনো নতুন গ্রেফতার করেনি শ্রীলঙ্কা চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে জ্বালানি সংকটে ভারতীয় নৌবাহিনীর এসকর্টে এলপিজি ট্যাঙ্কার হরমুজ পার, সরাসরি সম্প্রচার

রাজধানীতে তেলের সংকটে রাতভর অপেক্ষা, মানুষ ঘুম হারিয়েছে

রাজধানীতে তেলের সংকট: রাতভর লাইনে অপেক্ষা

ঢাকার বিজয় সরণি এলাকায় একটি তেলপাম্পের সামনে রাতের অন্ধকারে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য। শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে, যখন পুরো শহর ঘুমাচ্ছিল, তখন এখানে শত শত মানুষ তেলের জন্য চোখের ঘুম হারিয়েছে। উত্তরের মহাখালী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত গাড়ির সারি ছড়িয়ে পড়েছিল। হেডলাইটের আলোয় এবং তেলের জন্য অপেক্ষমান মানুষের ক্লান্ত মুখগুলো এক অস্থির সময়ের ছবি ফুটিয়েছে।

মোটরসাইকেল চালকের ক্লান্তি

রায়েরবাগ থেকে আসা মোটরসাইকেল চালক রাহিমুল ইসলাম ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তেলের আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাত ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ভোর ৪টার দিকে ৬০০ টাকার তেল পেয়েছেন। তিনি জানান, তিনি তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং প্রতিদিন রায়েরবাগ থেকে বাইকে যাতায়াত করতে হয়। তেলের সংকটের কারণে পাম্পগুলো এখন চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল দিচ্ছে, যা তার দুই-তিন দিনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। রাহিমুল বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন যদি এভাবে সাত-আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে জীবন সত্যিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় গ্রাহকরা – Daily Swadhin Shomoy

দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য

বিজয় সরণির পাম্প থেকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত গাড়ির লাইন ছড়িয়ে পড়েছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ৪৮৩টি মোটরসাইকেল, ৩৬৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ৩১টি পণ্যবাহী ট্রাক। অনেকেই ক্লান্তিতে মোটরসাইকেলের ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ মোবাইলে লুডু খেলছিলেন, আবার অনেকেই সড়ক বিভাজকের ওপর বসে সময় কাটাচ্ছিলেন।

সরবরাহ কমছে, আতঙ্ক বাড়ছে

পাম্পের সহকারী কর্মকর্তা মামুন হোসেন জানান, সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি পাওয়া যেত, এখন তা নেমে এসেছে ৩৭ থেকে ৪০ হাজার লিটারে। রিজার্ভারে যান্ত্রিক কারণে সবসময় ১৫০০ থেকে ২০০০ লিটার তেল রাখতে হয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় যারা ট্যাঙ্কি অর্ধেক পূর্ণ তাদেরাও তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

মানুষ আতঙ্কিত হয়ে কেনার প্রবণতা দেখাচ্ছে। কেউ বলছেন মা অসুস্থ, কেউ বলছেন জরুরি পণ্য সরবরাহ করতে হবে।

ভিড় সামলাতে পাম্প কর্তৃপক্ষ তিনটি আলাদা লাইন করেছে: মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য। তবুও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। লাইনে থাকা মানুষের ক্ষুধা মেটাতে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান এবং চা-সিগারেটের দোকানও মাঝরাতে ব্যস্ত থাকে।

শৌচাগারে ভিড়

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশে এই পাম্পের আশপাশে পরিচ্ছন্নতার জন্য ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার বসানো হয়েছে। ভিড় এত বেশি ছিল যে তা দেখলে মনে হচ্ছিল কোনো সমাবেশ চলছে।

চালকদের অসন্তোষ

উবার চালক সালাহ উদ্দিন বলেন, আগে অন্য একটি পাম্পে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি এখানে এসেছেন। তিনি মনে করেন, পাম্পের মালিকেরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। তালুকদার ফিলিং স্টেশনের একজন স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুলও রাতে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস এখন প্রতিদিন তেলের চিন্তায় বেড়ে গেছে।

নিজস্ব জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি জরুরি

নিয়ন্ত্রিত তেল বিক্রি

চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাম্পগুলো তেল বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিজয় সরণি পাম্পে প্রাইভেট কারের জন্য সর্বোচ্চ ২,৪০০ টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৬০০ টাকার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। বড় ট্রাকগুলো পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০০ লিটার। এই নিয়ন্ত্রণেও মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেলের নিশ্চয়তা খুঁজছেন।

সমাধানের অপেক্ষায়

শনিবার দিবগত রাত পেরিয়ে রবিবার সকাল সাড়ে ৬টায়ও লাইনে ক্রেতার চাপ কমেনি। পোষাক কারখানার মালবাহী ট্রাকের চালক হাবিবুল বলেন, সড়কপথের দুর্ভোগের সঙ্গে এখন তেলের সংকটও যুক্ত হয়েছে। রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্প রাতের সময়ে বন্ধ থাকায় হাতে গোনা কয়েকটি পাম্পে মানুষের ভিড় বেশি। সাধারণ মানুষ ও পরিবহন শ্রমিকেরা চায়, সরবরাহ স্বাভাবিক করে তেলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।

বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সকাল হলেও শত শত মানুষ পরবর্তী দিনের তেলের নিশ্চয়তা খুঁজতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের দাবী: তিন দিনে তিনটি আমেরিকার সামরিক বিমান ধ্বংস করেছে

রাজধানীতে তেলের সংকটে রাতভর অপেক্ষা, মানুষ ঘুম হারিয়েছে

১২:৩১:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীতে তেলের সংকট: রাতভর লাইনে অপেক্ষা

ঢাকার বিজয় সরণি এলাকায় একটি তেলপাম্পের সামনে রাতের অন্ধকারে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য। শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে, যখন পুরো শহর ঘুমাচ্ছিল, তখন এখানে শত শত মানুষ তেলের জন্য চোখের ঘুম হারিয়েছে। উত্তরের মহাখালী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত গাড়ির সারি ছড়িয়ে পড়েছিল। হেডলাইটের আলোয় এবং তেলের জন্য অপেক্ষমান মানুষের ক্লান্ত মুখগুলো এক অস্থির সময়ের ছবি ফুটিয়েছে।

মোটরসাইকেল চালকের ক্লান্তি

রায়েরবাগ থেকে আসা মোটরসাইকেল চালক রাহিমুল ইসলাম ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তেলের আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাত ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ভোর ৪টার দিকে ৬০০ টাকার তেল পেয়েছেন। তিনি জানান, তিনি তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং প্রতিদিন রায়েরবাগ থেকে বাইকে যাতায়াত করতে হয়। তেলের সংকটের কারণে পাম্পগুলো এখন চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল দিচ্ছে, যা তার দুই-তিন দিনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। রাহিমুল বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন যদি এভাবে সাত-আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে জীবন সত্যিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় গ্রাহকরা – Daily Swadhin Shomoy

দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য

বিজয় সরণির পাম্প থেকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত গাড়ির লাইন ছড়িয়ে পড়েছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ৪৮৩টি মোটরসাইকেল, ৩৬৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ৩১টি পণ্যবাহী ট্রাক। অনেকেই ক্লান্তিতে মোটরসাইকেলের ওপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ মোবাইলে লুডু খেলছিলেন, আবার অনেকেই সড়ক বিভাজকের ওপর বসে সময় কাটাচ্ছিলেন।

সরবরাহ কমছে, আতঙ্ক বাড়ছে

পাম্পের সহকারী কর্মকর্তা মামুন হোসেন জানান, সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি পাওয়া যেত, এখন তা নেমে এসেছে ৩৭ থেকে ৪০ হাজার লিটারে। রিজার্ভারে যান্ত্রিক কারণে সবসময় ১৫০০ থেকে ২০০০ লিটার তেল রাখতে হয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় যারা ট্যাঙ্কি অর্ধেক পূর্ণ তাদেরাও তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

মানুষ আতঙ্কিত হয়ে কেনার প্রবণতা দেখাচ্ছে। কেউ বলছেন মা অসুস্থ, কেউ বলছেন জরুরি পণ্য সরবরাহ করতে হবে।

ভিড় সামলাতে পাম্প কর্তৃপক্ষ তিনটি আলাদা লাইন করেছে: মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য। তবুও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। লাইনে থাকা মানুষের ক্ষুধা মেটাতে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান এবং চা-সিগারেটের দোকানও মাঝরাতে ব্যস্ত থাকে।

শৌচাগারে ভিড়

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশে এই পাম্পের আশপাশে পরিচ্ছন্নতার জন্য ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার বসানো হয়েছে। ভিড় এত বেশি ছিল যে তা দেখলে মনে হচ্ছিল কোনো সমাবেশ চলছে।

চালকদের অসন্তোষ

উবার চালক সালাহ উদ্দিন বলেন, আগে অন্য একটি পাম্পে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি এখানে এসেছেন। তিনি মনে করেন, পাম্পের মালিকেরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। তালুকদার ফিলিং স্টেশনের একজন স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুলও রাতে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস এখন প্রতিদিন তেলের চিন্তায় বেড়ে গেছে।

নিজস্ব জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি জরুরি

নিয়ন্ত্রিত তেল বিক্রি

চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাম্পগুলো তেল বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিজয় সরণি পাম্পে প্রাইভেট কারের জন্য সর্বোচ্চ ২,৪০০ টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৬০০ টাকার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। বড় ট্রাকগুলো পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০০ লিটার। এই নিয়ন্ত্রণেও মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেলের নিশ্চয়তা খুঁজছেন।

সমাধানের অপেক্ষায়

শনিবার দিবগত রাত পেরিয়ে রবিবার সকাল সাড়ে ৬টায়ও লাইনে ক্রেতার চাপ কমেনি। পোষাক কারখানার মালবাহী ট্রাকের চালক হাবিবুল বলেন, সড়কপথের দুর্ভোগের সঙ্গে এখন তেলের সংকটও যুক্ত হয়েছে। রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্প রাতের সময়ে বন্ধ থাকায় হাতে গোনা কয়েকটি পাম্পে মানুষের ভিড় বেশি। সাধারণ মানুষ ও পরিবহন শ্রমিকেরা চায়, সরবরাহ স্বাভাবিক করে তেলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।

বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সকাল হলেও শত শত মানুষ পরবর্তী দিনের তেলের নিশ্চয়তা খুঁজতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।