চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে এখন দেখা যাচ্ছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার এবং পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজ অলস বসে আছে। জ্বালানি সংকটের কারণে সাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত ট্রলার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজগুলো কার্যক্রম বন্ধের মুখে দাঁড়িয়েছে।
ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি
মৎস্যজীবী এবং লাইটার জাহাজের মালিকরা জানান, ডিজেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা সাগরে যেতে পারছেন না। সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরা এখন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলছেন, আনুমানিক ৩০-৪০ শতাংশ হ্রাস হয়েছে, তবে জেলে ও ট্রলার মালিকদের দাবি অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও গুরুতর।

লাইটার জাহাজের কার্যক্রম ব্যাহত
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ নানা পণ্য বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে স্থানান্তরিত হয়। লাইটার জাহাজগুলোর জন্য প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন, কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে মাত্র ৬০-৭০ হাজার লিটার পাওয়া যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসও থমকে যাচ্ছে।
লাইটার জাহাজ মালিকদের সংগঠন দুই দফায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েও সমস্যার সমাধান পায়নি। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আহ্বায়ক সফিক আহমেদ জানান, পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় লাইটার জাহাজগুলো সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে পারছে না।
মৎস্য ঘাট ও বাজারে প্রভাব
ফিশারি ঘাটে মাছের আগমন কমে যাওয়ায় বাজারেও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট ট্রলার ১৮০০ থেকে ২০০০ লিটার, বড় ট্রলার সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার ডিজেল নিয়ে সাগরে যায়। বর্তমানে পর্যাপ্ত তেল না থাকায় ছোট ট্রলার ৮-৯ দিন অথবা তার চেয়ে কম সময়ে ফিরে আসছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছও পাওয়া যাচ্ছে না।

ডিপোতে প্রভাব
চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোয় আমদানি ও রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনাও জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান জানান, দিনে ৬০-৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মৎস্যখাতে সামগ্রিক প্রভাব
জেলেরা বলছেন, নদীতে মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় উপকূলীয় মৎস্য বন্দর এবং মোকামগুলোতে কার্যক্রম প্রায় স্থবির। জেলে, আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক ও পরিবহনকর্মীদের ওপর প্রভাব পড়ছে। এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়েছে।

আগামী ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা
এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরা নিষিদ্ধ হবে। জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় ট্রলারগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হবে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোকে যথাযথ নির্দেশ দেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরের এই দৃশ্য পুরো মৎস্যখাতের জন্য সংকেত দিচ্ছে যে, জ্বালানি সংকট এবং প্রাকৃতিক বিধিনিষেধ একসাথে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















