জ্বালানি তেলের সংকটে দেশের প্রায় সব জেলার ফিলিং স্টেশন এখন অনিয়মিতভাবে চালু রাখা হচ্ছে। কোথাও দিনের বেশিরভাগ সময় পাম্প বন্ধ, কোথাও আবার দুই-তিন দিন পরপর তেল মিলছে। পাম্প মালিকদের দাবি, রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত সরবরাহের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সংকট সামাল দিতে কিছু উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। তাদের মতে, পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা কাটবে না।
চট্টগ্রামে অর্ধেকের বেশি পাম্পে তেল নেই
চট্টগ্রামের ৩৮৩টি ফিলিং স্টেশনের বড় অংশই দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকছে। নগরের হামজারবাগ এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে শুধু গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, অকটেন বা ডিজেল বিক্রি হচ্ছে না। কর্মচারীরা জানান, কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে জ্বালানি না আসায় তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
টাইগারপাস এলাকার আরেকটি পাম্পে মেশিনের ওপরে লিখে রাখা হয়েছে, অকটেন নেই। কর্মীরা বলছেন, নির্ধারিত তেল এলে বিক্রি শুরু হবে। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, পুরো বিভাগে ৩৮৩টি পাম্প, ৭৯৯ জন এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর এবং ২৫৫ জন প্যাকড পয়েন্ট ডিলার রয়েছেন। শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই ৬২টি পাম্প আছে, যার অর্ধেকের বেশি বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে।
পাম্প মালিকদের ভাষ্য, এক মাস ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও অকটেন আছে, ডিজেল নেই; কোথাও ডিজেল আছে, অকটেন নেই। ফলে বিক্রেতা ও গ্রাহক—দু’পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে আগের তুলনায় চাহিদা দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
চট্টগ্রাম পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের এক নেতা বলেন, নগরের ৬২টি পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী তেল পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি বেশি। যে পরিমাণ তেল আসে, চাহিদা বেশি থাকায় খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বরিশালে জেলেরা বিপদে, বাড়তি দামে ডিজেল
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৫৭টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। তেল সংকট শুরুর পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই এসব পাম্পে জ্বালানি থাকে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালক ও নৌযানচালকেরা। বিশেষ করে ডিজেলের অভাবে জেলেরা নদী বা সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০০ লিটারের এক ব্যারেল ডিজেলের সরকারি দাম ২১ হাজার টাকা হলেও এখন তা ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাছ ধরা কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
পাম্প মালিকদের সংগঠনের এক নেতা জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পাম্পে তেল থাকে না। পাম্প পুরোপুরি বন্ধ না রেখে ‘নাই’ লিখে মেশিনের ওপর কাগজ সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। রেশনিং করে তেল বিক্রি করতে গিয়ে মালিক ও কর্মচারীদের প্রায়ই ক্রেতাদের বিরূপ আচরণের মুখে পড়তে হচ্ছে।
রাজশাহীতে ৪৬টির মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০টি পাম্পে বিক্রি

রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলিয়ে নিবন্ধিত ফিলিং স্টেশন ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ১০টিতে তেল বিক্রি হচ্ছে। বাকিগুলো বন্ধ থাকছে। যেসব পাম্প খোলা থাকছে, সেখানে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন।
তেলের অভাবে কৃষকেরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। বোরো চাষিরা শ্যালো ইঞ্জিন নিয়ে পাম্পে এসে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরবরাহ ব্যয়ের বাড়তি চাপ। আগে খুলনা থেকে রেলপথে রাজশাহীর ডিপোতে তেল আসত। এখন সেটি বন্ধ থাকায় সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে, ফলে খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে।
পাম্প মালিকেরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় তাদের হাতে মজুত নেই। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অনেকে প্রয়োজনের বাইরে তেল নিচ্ছেন, আবার বাইরের এলাকার লোকেরাও এসে তেল সংগ্রহ করছেন। এ অবস্থায় ফুয়েল কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহে চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ
ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় ১১৫টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। বাকি পাম্পগুলো খোলা থাকলেও দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে, কারণ চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের। কোথাও পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যাচ্ছে—এমন খবর ছড়ালেই চারদিক থেকে চালকেরা সেখানে ছুটে যাচ্ছেন। দীর্ঘ লাইন দিয়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন।
শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় একই চিত্র। মালিকদের ভাষ্য, গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে তারা আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম তেল পাচ্ছেন। ডিজেলের সংকট তুলনামূলক কম হলেও পেট্রোল ও অকটেনের সংকট প্রকট।

খুলনায় তেল পেলে পাম্প খোলে, না পেলে বন্ধ
খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও ফরিদপুর মিলিয়ে ২৬০টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সবগুলো সচল থাকলেও দুই-তিন দিন পরপর তেল পাওয়ায় যেদিন সরবরাহ থাকে না, সেদিন পাম্প বন্ধ রাখতে হয়।
খুলনা বিভাগের ট্যাংকলরি মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, কিছুদিন ধরে সব স্টেশনেই জ্বালানি সংকট চলছে। এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দাবি জানানো হলেও এখনো সমাধান হয়নি। কবে নাগাদ হবে, সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
একটি পাম্পের সুপারভাইজার জানান, একদিন আট হাজার লিটার তেল পেলেও রাত ৯টায় বন্ধ অবস্থায় পাম্পের সামনে দেড় শতাধিক মোটরসাইকেল অপেক্ষায় ছিল। অনেকে ধারণা করছেন, সরবরাহ এলেই তেল মজুত করে রাখবেন। এতে চাপ আরও বাড়ছে।
রংপুরে পেট্রোল-অকটেনের তীব্র ঘাটতি
রংপুর বিভাগের আট জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। অনেক পাম্পে শুধু সিএনজি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, পেট্রোল বা অকটেন নেই। যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে শেষে তেল না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা ১০ লাখ লিটার, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ লাখ লিটার। পেট্রোলের দৈনিক চাহিদা ৫ লাখ ১০ হাজার লিটার হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ থেকে সোয়া ২ লাখ লিটার। অকটেনের চাহিদা ২ লাখ ৭৫ হাজার লিটার, সরবরাহ হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার। ফলে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।

তবে বিভাগীয় কমিশনার দাবি করেছেন, জ্বালানির প্রকৃত সংকট নেই, বরং কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগে একেকটি ট্যাংকলরিতে পুরো পরিমাণ তেল মিললেও এখন চাহিদার অর্ধেক, কখনও তারও কম সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটে সরবরাহ আছে, কিন্তু লজিস্টিক সমস্যা
সিলেটে তেলের সংকট তুলনামূলক কম। তবে উপজেলা পর্যায়ের পাম্পগুলো লজিস্টিক সাপোর্টের সমস্যায় ভুগছে। ডিপো থেকে বরাদ্দ থাকলেও পরিবহন খরচের চাপের কারণে ছোট পাম্প মালিকেরা বিপাকে পড়ছেন। অনেকের নিজস্ব লরি নেই, পুঁজিও সীমিত। ফলে বরাদ্দ পাওয়া তেল বিক্রি করেও খরচ তুলতে পারছেন না।
সিলেট নগরী এবং জেলার শহরাঞ্চলের পাম্পগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন। সেখানে পেট্রোল বা অকটেনের চাহিদা কম, ডিজেলের চাহিদা বেশি। কিন্তু বরাদ্দ ও পরিবহন ব্যয়ের ভার সামলানো অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংকটের প্রভাব বহুমুখী
এই জ্বালানি সংকট শুধু যানবাহন চলাচলেই সমস্যা তৈরি করছে না, কৃষি, মৎস্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। কৃষকেরা সেচ দিতে পারছেন না, জেলেরা নদী ও সাগরে যেতে পারছেন না, পরিবহন খাতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অনেক স্থানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
পাম্প মালিকদের দাবি, রেশনিং তুলে দিয়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, মনিটরিং বাড়ানো হচ্ছে, যাতে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















