০১:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ম্যালেরিয়ার মতো জটিল রোগ কি শিশুদের মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে? টিকা সংকট- বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস ও বিতর্ক: অতীতের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক ক্রীড়া রেফারিদের অধিকার রক্ষায় আজীবন লড়াই: ব্যারি মানোর প্রভাব ও উত্তরাধিকার আমেরিকার প্রথম মহাসড়কের গল্প: ন্যাশনাল রোডে গড়ে ওঠা এক জাতির সংযোগ চক্ষু চিকিৎসক থেকে শিল্পসংগ্রাহক: জাপানি ও আমেরিকান শিল্পে আজীবন নিবেদিত কার্ট গিটার ফ্যাশন দুনিয়ায় ‘ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’: ব্যঙ্গ থেকে বাণিজ্যে রূপান্তরের গল্প এআই যুগে মানব বুদ্ধিমত্তা রক্ষার লড়াই: গবেষণায় উঠে এল চমকপ্রদ সত্য হামাসের হাতে ছেলেকে হারানোর পর যে শোক আর কমে না চার্টারের আয় পূর্বাভাসে ধাক্কা, গ্রাহক হারিয়ে শেয়ারে বড় পতন

ইরান কেন এই যুদ্ধপর্বে কৌশলগতভাবে এগিয়ে গেল

যুদ্ধের পর যা সামনে এসেছে, তা প্রকৃত শান্তি নয়, বিশ্বাসযোগ্য কোনো সমঝোতাও নয়; বরং এটি এমন এক সাময়িক বিরতি, যা আমেরিকার শক্তির সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে।

ওয়াশিংটনে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে দ্রুত উত্তেজনা হ্রাসের শুরু এবং চাপ প্রয়োগের সফল ফল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মোড়ক সরিয়ে ঘটনাকে কৌশলগত বাস্তবতায় দেখলে ভিন্ন ছবি দেখা যায়। যা ঘটেছে, তা হলো চাপের মুখে গৃহীত একটি বিরতি, যার ব্যাখ্যা ওয়াশিংটন এবং তেহরানে একেবারেই আলাদা। এই ব্যবধানই দেখায়, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; বরং এক অসমাপ্ত সংঘাতের মধ্যবর্তী শ্বাস নেওয়ার সময়, যেখানে মূল রাজনৈতিক বিরোধ এখনো অমীমাংসিত।

অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বৈশ্বিক জনমতের চোখে এই পর্যায়ে ইরানই যেন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা পক্ষ। কারণ তারা আঘাত সহ্য করেছে, পাল্টা জবাব দিয়েছে, আত্মসমর্পণ করেনি এবং ধীরে ধীরে যুদ্ধের গতিপথের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভেবেছিল তারা সংঘাতের নিয়ম ঠিক করবে এবং ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করে সেটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি ঘটেনি। ইরান শুধু চাপ মানেনি তা নয়, যুদ্ধের মূল্য এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মার্কিন সামরিক অভিযান নিজেই আমেরিকার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠেছে।

আমরা তোমাদের হামলা করতে চাইছি না' প্রতিবেশী দেশগ...

কেন পিছু হটল ওয়াশিংটন

শুরু থেকেই এই অভিযানের ভিত্তি ছিল পরিচিত এক কৌশল: ধ্বংসাত্মক হামলা ও কঠোর হুমকির সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে বাইরের শর্ত মানতে বাধ্য করা। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতিতে এই পদ্ধতি নতুন নয়। প্রথমে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করা হয়, তারপর প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণ অথবা ধ্বংসের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, এবং কোনো কৌশলগত ছাড় আদায় করতে পারলেই সেটিকে মার্কিন ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ বলা হয়।

কিন্তু ইরান আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বড় আকারের রাষ্ট্র, যার ভেতরে সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক সহনশীলতা এবং ঐতিহাসিক চেতনা আছে, তাকে এক দফা আঘাতেই ভেঙে ফেলা সহজ নয়। ইরান অক্ষত নয়, কিন্তু তাকে ভেঙে দেওয়াও কঠিন। দেশটির নেতৃত্ব টিকে আছে, রাষ্ট্রব্যবস্থা ধসে পড়েনি, পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা একেবারে বিলীন হয়নি এবং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তাদের কৌশলগত প্রভাবও অটুট আছে বলেই মনে হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে হঠাৎ অবস্থান বদলকে বিজয়ীর আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার তাড়াহুড়ো হিসেবে দেখা যায়। বিরতি ঘোষণার আগে মার্কিন বক্তব্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে ইরান যদি হরমুজে ওয়াশিংটনের শর্ত অনুযায়ী চলাচল নিশ্চিত না করে, তবে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করার হুমকিও উঠে আসে। এতে স্পষ্ট হয়, সংকট খুবই বিপজ্জনক সীমায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পরে হঠাৎ হামলা থামানো এবং আলোচনার দিকে ঝুঁকে পড়া দেখায়, চাপ শুধু ইরানের ওপর নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও কাজ করতে শুরু করেছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনকে বহুস্তরীয় ঝুঁকির মুখে পড়তে হতো। সামরিক অনিশ্চয়তা ছিল, মিত্রদের অস্বস্তি বাড়ছিল, বাজার অস্থির হচ্ছিল, আর দ্রুত ও স্পষ্ট ফল ছাড়া দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছিল।

ইরানে হামলা: আমেরিকা যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে – ইরান কীভাবে জবাব দেবে?  - BBC News বাংলা

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঝুঁকি

ট্রাম্পের জন্য ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ মানে শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, ঘরোয়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পরীক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা দ্রুতই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তেলের দাম ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা, মার্কিন স্থাপনা ও ঘাঁটিতে হামলার আশঙ্কা, নতুন প্রাণহানির ঝুঁকি, রাজনৈতিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারত।

একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ কমই আছে যে, তাকে এমন নেতা হিসেবে দেখা হবে, যিনি দেশকে আরেকটি যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন, কিন্তু সেখান থেকে কৌশলগত সাফল্য আনার পরিষ্কার পথ নেই। দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যদি ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকে, তবে তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া আচরণ, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং নাটকীয় শক্তি প্রদর্শনকে ব্যর্থতায় পরিণত করার অভিযোগ উঠতে পারত। এ কারণেই হোয়াইট হাউসকে সর্বোচ্চ চাপের ভাষা থেকে যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে কোনো আলাপ নেই, তাদের কিছু দিচ্ছিও না: ট্রাম্প

ইরানের ক্ষতি, কিন্তু ভেঙে পড়েনি

সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে গুরুতর ক্ষতি করেছে, এতে সন্দেহ নেই। অবকাঠামো আক্রান্ত হয়েছে, উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে, সামাজিক চাপও তীব্র হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধকে শুধু ধ্বংস হওয়া লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শেষ পর্যন্ত দেখা হয়, বলপ্রয়োগ কি ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে কি না। আর এই ক্ষেত্রে ইরানের ভেতরে যে রাজনৈতিক ভাঙন চাওয়া হয়েছিল, তা ঘটেনি।

ইরান পাল্টা জবাব দিয়েছে শুধু সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও মানসিকভাবেও। এত বড় মাত্রার বাইরের চাপ সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একদিকে ভয়, ক্লান্তি ও ক্ষোভ বাড়ায়; অন্যদিকে সমাজ যদি মনে করে এটি শুধু সরকারের বিরুদ্ধে চাপ নয়, পুরো দেশ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সত্তার ওপর আক্রমণ, তবে জাতীয় ঐক্যও বাড়াতে পারে। এখানে সম্ভবত সেটিই ঘটেছে। উদ্বেগ, বিভ্রান্তি ও ক্লান্তি থাকলেও যুদ্ধ একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংহতি, জনসমর্থন ও জাতীয় টিকে থাকার অনুভূতিকে জোরদার করেছে।

ফলে অনেকের চোখে ইরান এই পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে। তারা নিজেদের সহনশীলতাকে রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে, আর শক্তিশালী অবস্থান থেকে যুদ্ধ শুরু করা প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামানোর পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতি কী | প্রথম আলো

অভ্যন্তরীণ সংকটের ওপরে জাতীয় টিকে থাকার প্রশ্ন

এর মানে এই নয় যে ইরানের ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। দেশটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভরা। কিন্তু সরাসরি সামরিক হামলা, অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হুমকি এবং প্রকাশ্য বাইরের আগ্রাসন দেশের ভেতরের অগ্রাধিকার বদলে দেয়। তখন অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ পেছনে সরে যায়, সামনে আসে জাতীয় টিকে থাকার প্রশ্ন।

এই অর্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ফল চেয়েছিল, ঘটনাপ্রবাহ তার উল্টো দিকেও গেছে। ইরানি সমাজের ভেতরের ফাঁক আরও বড় করার বদলে যুদ্ধ তা কিছুটা শক্ত করেছে। যত বেশি এই সংঘাতকে পুরো জাতির বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়েছে, তত কমেছে ভেতরের বিভাজনের সম্ভাবনা, আর তত বেড়েছে প্রতিরোধকেই মর্যাদাপূর্ণ পথ হিসেবে দেখার প্রবণতা।

ইরানের জন্য এটি নিখাদ বিজয় নয়। ক্ষয়ক্ষতি বড়, অর্থনৈতিক চাপও রয়ে গেছে, নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকিও শেষ হয়নি। তবু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুধু কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা নয়, কে ভাঙেনি—এটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইরান নিজেকে অন্যের ইচ্ছার নিষ্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত হতে দেয়নি। বরং তারা রাজনৈতিক উদ্যোগের অংশ হয়ে উঠেছে। যে পক্ষ যুদ্ধ শুরু করেছিল আত্মসমর্পণ আদায়ের প্রত্যাশায়, যদি শেষ পর্যন্ত তাকে মধ্যস্থতা ও দরকষাকষির টেবিলে ফিরতে হয়, তবে প্রথম পরিকল্পনাই যে ব্যর্থ হয়েছে, তা স্পষ্ট।

মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা

এই যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ। সংঘাত খুব দ্রুতই শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সীমায় আটকে থাকেনি। এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—বিশেষত সেই কাঠামোকে, যা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আরব রাজতন্ত্রগুলোর সামনে বহুদিন ধরে একটি সরল সমীকরণ রাখা হয়েছিল: যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা দেবে, আর আঞ্চলিক মিত্ররা তার বিনিময়ে চুক্তি, রাজনৈতিক আনুগত্য ও আংশিক কৌশলগত নির্ভরতা মেনে নেবে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে বড় যুদ্ধ দেখিয়ে দিল, এই নিরাপত্তা কাঠামো আর আগের মতো নিশ্চিত বা নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। তেহরানের সঙ্গে বড় সংঘাত মানেই ঘাঁটি, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথগুলো ঝুঁকির এলাকায় পরিণত হওয়া।

এ কারণেই যুদ্ধবিরতির পর উপসাগরীয় বাজারের প্রতিক্রিয়ায় স্বস্তির আবহ ছিল স্পষ্ট। অঞ্চলটি অন্তত সাময়িকভাবে বিপর্যয়ের কিনারা থেকে সরে এসেছে—এই অনুভূতিই সেখানে কাজ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নিরাপত্তা চুক্তির পথে সিরিয়া-ইসরায়েল

 

ইউরোপের দূরত্ব ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গেছে। কেউ প্রকাশ্যে জোট ছাড়েনি, কিন্তু পুরো যুদ্ধজুড়ে সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষণ ছিল। ইউরোপ যুদ্ধের সম্প্রসারণের চেয়ে সংঘাত থামানো ও কূটনীতিতে ফেরাকে বেশি স্বাগত জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইরান অভিযানকে মিত্রদের যৌথ উদ্দেশ্যে পরিণত করতে পারেনি। ফলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মতির যে চিত্র আমেরিকা তুলে ধরতে চায়, সেটিও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বৈশ্বিক স্তরেও এর প্রভাব অনেক দূর গেছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো সংকট সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, সমুদ্রপথে বাণিজ্য, বিমা বাজার, জ্বালানির দাম এবং আর্থিক ব্যবস্থার মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ থামার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা-ই বলে দেয় এই সংঘাত ছিল ব্যবস্থাগত ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি বিশেষভাবে অস্বস্তিকর, কারণ দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেকে শুধু শক্তিধর রাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক শৃঙ্খলার উৎস হিসেবেও তুলে ধরেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন শক্তি ক্রমে শৃঙ্খলার বদলে বিশৃঙ্খলার উৎপাদক হিসেবেও দেখা পড়তে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে

স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কতটা

বর্তমান বিরতিকে কৌশলগত সমাধান বলা কঠিন; এটি অনেক বেশি একটি সাময়িক থামা। হোয়াইট হাউসের অবস্থান পরিবর্তন ছিল খুবই দ্রুত ও আকস্মিক। কিছুদিন আগেও বক্তব্য ছিল প্রায় বিপর্যয়মূলক সুরে, আর অল্প সময়ের মধ্যে তা গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যৎ সমঝোতার ভাষায় রূপ নেয়। সাধারণত এমন বৈপরীত্য বোঝায়, আগের পরিকল্পনা হয় ব্যর্থ হয়েছে, নয়তো তা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আলোচনার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ঘটনাকে সফল চাপ প্রয়োগের ফল হিসেবে দেখাতে, আর তেহরান জোর দিচ্ছে—যুদ্ধবিরতি মানে তাদের সার্বভৌম অবস্থান থেকে সরে আসা নয়, কিংবা আগ্রাসী পক্ষ সঠিক ছিল তা মেনে নেওয়াও নয়।

বিরতির ব্যাখ্যা নিয়েও লড়াই চলছে। খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেটিকে তারা স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। এর কিছু শর্ত অতীতে ওয়াশিংটন নাকচ করেছিল। কিন্তু এমন একটি প্রস্তাব এখন আলোচনায় আছে—এই সত্যটাই দেখায়, সংঘাত থামানোর কাঠামো নিয়ে কথা বলতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে, আর ইরানও নিজের শর্ত উত্থাপনের অবস্থানে এসেছে।

দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থাহীনতা এত গভীর যে, মধ্যস্থতাকারী ছাড়া আলোচনা এগোনো কঠিন। প্রত্যেকেই চায় এমন একটি নমনীয় সূত্র, যা বাস্তবে গ্রহণ করা যায়, কিন্তু প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান ছাড়তে না হয়। ওয়াশিংটন চায় বিরতিকে শক্তির ফল হিসেবে দেখা হোক, তেহরান চায় এটিকে সহনশীলতা ও সফল প্রতিরোধের ফল হিসেবে তুলে ধরতে। এই ব্যাখ্যার লড়াইটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

দুই পক্ষের বিপরীত লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো নৌপথের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা, ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা কমানো এবং এমনভাবে আলোচনা সাজানো, যাতে ঘরোয়া রাজনীতিতে বলা যায়—প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসও চায় না এই সংঘাত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত যুদ্ধে পরিণত হোক।

অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের দৃঢ়তার রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে, নতুন হামলার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা পেতে, সাময়িক বিরতিকে যাতে নতুন চাপের প্রস্তুতিপর্বে পরিণত না করা যায় তা নিশ্চিত করতে, এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কিছু শর্ত অন্তত নিজেরাও নির্ধারণ করতে। ফলে এই সংঘাত দ্রুত মুছে যাওয়ার মতো নয়। এখানে শুধু কারিগরি ব্যবস্থাপনা নয়, কী ঘটেছে তার অর্থ নিয়েও দ্বন্দ্ব চলছে। এক পক্ষ বলপ্রয়োগের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে চায়, আর অন্য পক্ষ কার্যত তার সীমা দেখিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান : বন্ধু থেকে যেভাবে হয়ে ওঠে চিরশত্রু | দৈনিক নয়া দিগন্ত

ইসরায়েল প্রসঙ্গ

ইসরায়েল সরাসরি হামলাকারী এবং চাপের অভিযানের সক্রিয় অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের ভূমিকা কিছুটা আড়ালে চলে গেছে, কারণ ট্রাম্পের তীব্র বক্তব্য ও আলটিমেটাম আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহে ইসরায়েল প্রসঙ্গকে ছাপিয়ে গেছে। ফলে নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে সমালোচনার কেন্দ্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছেন, যখন সেটিই তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের মনোযোগ যখন কেন্দ্রীভূত, তখন ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে দখল, ধ্বংস এবং সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। এতে বোঝা যায়, বড় আকারের এক সংকটের আড়ালে ইসরায়েলের অন্যান্য পদক্ষেপ কত সহজে আন্তর্জাতিক নজরের বাইরে চলে যেতে পারে, যদিও অঞ্চল অস্থিতিশীল করার প্রধান উৎসগুলোর একটি তারা নিজেই।

যদি এই বিরতি বাস্তবে লেবানন পর্যন্ত না বাড়ে, তবে যুদ্ধ সত্যিকার অর্থে শেষ হয়নি; কেবল আংশিকভাবে নতুন বিন্যাস নিয়েছে। এক ফ্রন্ট সাময়িক ঠান্ডা, আরেকটি সক্রিয়; এবং দুই ফ্রন্ট আবারও একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। এটাই সাময়িক বিরতির সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। কৌশলগত শান্তি মানে নতুন ভারসাম্য ও নতুন ব্যবস্থা। এখানে তার কিছুই তৈরি হয়নি। কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে উত্তেজনা ত্যাগ করেনি। কোনো নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতাও স্থির হয়নি। সংঘাত থেমেছে, কিন্তু কাটিয়ে ওঠা যায়নি।

শেষ হিসাব

এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আমেরিকান কৌশলের একটি কাঠামোগত ভুলকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাপের নীতি ছাড়েনি, কিন্তু তাদের মানতে হয়েছে—এই পর্যায়ের চাপ প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল দেয়নি। ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানের সহনশীলতাকে, তাদের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাত্রাকে, বৈশ্বিক বাজারের সংবেদনশীলতাকে, মিত্রদের উদ্বেগকে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকিকে কম করে দেখেছিল। সেই কারণেই দ্রুত সংকটকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও মধ্যস্থতাপূর্ণ আলোচনার কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে।

ইরানের জন্য, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও, এই পর্বটি রাজনৈতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। এই কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব সম্ভবত বিশ্বদৃষ্টির পরিবর্তনে মাপা হবে। বিশ্ব দেখেছে, ওয়াশিংটন এখনো বড় আঞ্চলিক বিপর্যয়ের কিনারায় পরিস্থিতি ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও দেখেছে, আগের মতো নিশ্চিত গতি ও আত্মবিশ্বাসে সামরিক উত্তেজনাকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক শৃঙ্খলায় রূপান্তর করা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজ নয়।

বিশ্ব আরও দেখেছে, ইরানকে গুরুতরভাবে আঘাত করা যায়, কিন্তু সহজে ভাঙা যায় না। এবং যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাপিয়ে দিলেও, ইরান এমনভাবে সাড়া দিয়েছে যে বহু সমাজের চোখে তারাই সহনশীলতা, উদ্যোগ এবং কৌশলগত স্থিরতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণেই বর্তমান বিরতিকে অনেকের কাছে আমেরিকান শক্তির বিজয় নয়, বরং তার সীমারেখা উন্মোচিত হওয়ার মুহূর্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ম্যালেরিয়ার মতো জটিল রোগ কি শিশুদের মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে?

ইরান কেন এই যুদ্ধপর্বে কৌশলগতভাবে এগিয়ে গেল

০৩:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধের পর যা সামনে এসেছে, তা প্রকৃত শান্তি নয়, বিশ্বাসযোগ্য কোনো সমঝোতাও নয়; বরং এটি এমন এক সাময়িক বিরতি, যা আমেরিকার শক্তির সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে।

ওয়াশিংটনে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে দ্রুত উত্তেজনা হ্রাসের শুরু এবং চাপ প্রয়োগের সফল ফল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মোড়ক সরিয়ে ঘটনাকে কৌশলগত বাস্তবতায় দেখলে ভিন্ন ছবি দেখা যায়। যা ঘটেছে, তা হলো চাপের মুখে গৃহীত একটি বিরতি, যার ব্যাখ্যা ওয়াশিংটন এবং তেহরানে একেবারেই আলাদা। এই ব্যবধানই দেখায়, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; বরং এক অসমাপ্ত সংঘাতের মধ্যবর্তী শ্বাস নেওয়ার সময়, যেখানে মূল রাজনৈতিক বিরোধ এখনো অমীমাংসিত।

অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বৈশ্বিক জনমতের চোখে এই পর্যায়ে ইরানই যেন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা পক্ষ। কারণ তারা আঘাত সহ্য করেছে, পাল্টা জবাব দিয়েছে, আত্মসমর্পণ করেনি এবং ধীরে ধীরে যুদ্ধের গতিপথের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভেবেছিল তারা সংঘাতের নিয়ম ঠিক করবে এবং ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করে সেটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি ঘটেনি। ইরান শুধু চাপ মানেনি তা নয়, যুদ্ধের মূল্য এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মার্কিন সামরিক অভিযান নিজেই আমেরিকার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠেছে।

আমরা তোমাদের হামলা করতে চাইছি না' প্রতিবেশী দেশগ...

কেন পিছু হটল ওয়াশিংটন

শুরু থেকেই এই অভিযানের ভিত্তি ছিল পরিচিত এক কৌশল: ধ্বংসাত্মক হামলা ও কঠোর হুমকির সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে বাইরের শর্ত মানতে বাধ্য করা। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতিতে এই পদ্ধতি নতুন নয়। প্রথমে সর্বোচ্চ চাপ তৈরি করা হয়, তারপর প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণ অথবা ধ্বংসের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, এবং কোনো কৌশলগত ছাড় আদায় করতে পারলেই সেটিকে মার্কিন ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ বলা হয়।

কিন্তু ইরান আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বড় আকারের রাষ্ট্র, যার ভেতরে সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক সহনশীলতা এবং ঐতিহাসিক চেতনা আছে, তাকে এক দফা আঘাতেই ভেঙে ফেলা সহজ নয়। ইরান অক্ষত নয়, কিন্তু তাকে ভেঙে দেওয়াও কঠিন। দেশটির নেতৃত্ব টিকে আছে, রাষ্ট্রব্যবস্থা ধসে পড়েনি, পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা একেবারে বিলীন হয়নি এবং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তাদের কৌশলগত প্রভাবও অটুট আছে বলেই মনে হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে হঠাৎ অবস্থান বদলকে বিজয়ীর আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার তাড়াহুড়ো হিসেবে দেখা যায়। বিরতি ঘোষণার আগে মার্কিন বক্তব্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে ইরান যদি হরমুজে ওয়াশিংটনের শর্ত অনুযায়ী চলাচল নিশ্চিত না করে, তবে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করার হুমকিও উঠে আসে। এতে স্পষ্ট হয়, সংকট খুবই বিপজ্জনক সীমায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পরে হঠাৎ হামলা থামানো এবং আলোচনার দিকে ঝুঁকে পড়া দেখায়, চাপ শুধু ইরানের ওপর নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও কাজ করতে শুরু করেছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনকে বহুস্তরীয় ঝুঁকির মুখে পড়তে হতো। সামরিক অনিশ্চয়তা ছিল, মিত্রদের অস্বস্তি বাড়ছিল, বাজার অস্থির হচ্ছিল, আর দ্রুত ও স্পষ্ট ফল ছাড়া দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছিল।

ইরানে হামলা: আমেরিকা যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে – ইরান কীভাবে জবাব দেবে?  - BBC News বাংলা

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঝুঁকি

ট্রাম্পের জন্য ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ মানে শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, ঘরোয়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও পরীক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা দ্রুতই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তেলের দাম ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা, মার্কিন স্থাপনা ও ঘাঁটিতে হামলার আশঙ্কা, নতুন প্রাণহানির ঝুঁকি, রাজনৈতিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারত।

একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ কমই আছে যে, তাকে এমন নেতা হিসেবে দেখা হবে, যিনি দেশকে আরেকটি যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন, কিন্তু সেখান থেকে কৌশলগত সাফল্য আনার পরিষ্কার পথ নেই। দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যদি ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকে, তবে তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া আচরণ, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং নাটকীয় শক্তি প্রদর্শনকে ব্যর্থতায় পরিণত করার অভিযোগ উঠতে পারত। এ কারণেই হোয়াইট হাউসকে সর্বোচ্চ চাপের ভাষা থেকে যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে কোনো আলাপ নেই, তাদের কিছু দিচ্ছিও না: ট্রাম্প

ইরানের ক্ষতি, কিন্তু ভেঙে পড়েনি

সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে গুরুতর ক্ষতি করেছে, এতে সন্দেহ নেই। অবকাঠামো আক্রান্ত হয়েছে, উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে, সামাজিক চাপও তীব্র হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধকে শুধু ধ্বংস হওয়া লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শেষ পর্যন্ত দেখা হয়, বলপ্রয়োগ কি ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে কি না। আর এই ক্ষেত্রে ইরানের ভেতরে যে রাজনৈতিক ভাঙন চাওয়া হয়েছিল, তা ঘটেনি।

ইরান পাল্টা জবাব দিয়েছে শুধু সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও মানসিকভাবেও। এত বড় মাত্রার বাইরের চাপ সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একদিকে ভয়, ক্লান্তি ও ক্ষোভ বাড়ায়; অন্যদিকে সমাজ যদি মনে করে এটি শুধু সরকারের বিরুদ্ধে চাপ নয়, পুরো দেশ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সত্তার ওপর আক্রমণ, তবে জাতীয় ঐক্যও বাড়াতে পারে। এখানে সম্ভবত সেটিই ঘটেছে। উদ্বেগ, বিভ্রান্তি ও ক্লান্তি থাকলেও যুদ্ধ একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংহতি, জনসমর্থন ও জাতীয় টিকে থাকার অনুভূতিকে জোরদার করেছে।

ফলে অনেকের চোখে ইরান এই পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে। তারা নিজেদের সহনশীলতাকে রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে, আর শক্তিশালী অবস্থান থেকে যুদ্ধ শুরু করা প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামানোর পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতি কী | প্রথম আলো

অভ্যন্তরীণ সংকটের ওপরে জাতীয় টিকে থাকার প্রশ্ন

এর মানে এই নয় যে ইরানের ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। দেশটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভরা। কিন্তু সরাসরি সামরিক হামলা, অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হুমকি এবং প্রকাশ্য বাইরের আগ্রাসন দেশের ভেতরের অগ্রাধিকার বদলে দেয়। তখন অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ পেছনে সরে যায়, সামনে আসে জাতীয় টিকে থাকার প্রশ্ন।

এই অর্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ফল চেয়েছিল, ঘটনাপ্রবাহ তার উল্টো দিকেও গেছে। ইরানি সমাজের ভেতরের ফাঁক আরও বড় করার বদলে যুদ্ধ তা কিছুটা শক্ত করেছে। যত বেশি এই সংঘাতকে পুরো জাতির বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়েছে, তত কমেছে ভেতরের বিভাজনের সম্ভাবনা, আর তত বেড়েছে প্রতিরোধকেই মর্যাদাপূর্ণ পথ হিসেবে দেখার প্রবণতা।

ইরানের জন্য এটি নিখাদ বিজয় নয়। ক্ষয়ক্ষতি বড়, অর্থনৈতিক চাপও রয়ে গেছে, নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকিও শেষ হয়নি। তবু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুধু কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা নয়, কে ভাঙেনি—এটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইরান নিজেকে অন্যের ইচ্ছার নিষ্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত হতে দেয়নি। বরং তারা রাজনৈতিক উদ্যোগের অংশ হয়ে উঠেছে। যে পক্ষ যুদ্ধ শুরু করেছিল আত্মসমর্পণ আদায়ের প্রত্যাশায়, যদি শেষ পর্যন্ত তাকে মধ্যস্থতা ও দরকষাকষির টেবিলে ফিরতে হয়, তবে প্রথম পরিকল্পনাই যে ব্যর্থ হয়েছে, তা স্পষ্ট।

মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা

এই যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ। সংঘাত খুব দ্রুতই শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সীমায় আটকে থাকেনি। এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—বিশেষত সেই কাঠামোকে, যা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আরব রাজতন্ত্রগুলোর সামনে বহুদিন ধরে একটি সরল সমীকরণ রাখা হয়েছিল: যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা দেবে, আর আঞ্চলিক মিত্ররা তার বিনিময়ে চুক্তি, রাজনৈতিক আনুগত্য ও আংশিক কৌশলগত নির্ভরতা মেনে নেবে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে বড় যুদ্ধ দেখিয়ে দিল, এই নিরাপত্তা কাঠামো আর আগের মতো নিশ্চিত বা নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। তেহরানের সঙ্গে বড় সংঘাত মানেই ঘাঁটি, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথগুলো ঝুঁকির এলাকায় পরিণত হওয়া।

এ কারণেই যুদ্ধবিরতির পর উপসাগরীয় বাজারের প্রতিক্রিয়ায় স্বস্তির আবহ ছিল স্পষ্ট। অঞ্চলটি অন্তত সাময়িকভাবে বিপর্যয়ের কিনারা থেকে সরে এসেছে—এই অনুভূতিই সেখানে কাজ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নিরাপত্তা চুক্তির পথে সিরিয়া-ইসরায়েল

 

ইউরোপের দূরত্ব ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গেছে। কেউ প্রকাশ্যে জোট ছাড়েনি, কিন্তু পুরো যুদ্ধজুড়ে সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষণ ছিল। ইউরোপ যুদ্ধের সম্প্রসারণের চেয়ে সংঘাত থামানো ও কূটনীতিতে ফেরাকে বেশি স্বাগত জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইরান অভিযানকে মিত্রদের যৌথ উদ্দেশ্যে পরিণত করতে পারেনি। ফলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মতির যে চিত্র আমেরিকা তুলে ধরতে চায়, সেটিও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বৈশ্বিক স্তরেও এর প্রভাব অনেক দূর গেছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যেকোনো সংকট সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, সমুদ্রপথে বাণিজ্য, বিমা বাজার, জ্বালানির দাম এবং আর্থিক ব্যবস্থার মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ থামার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা-ই বলে দেয় এই সংঘাত ছিল ব্যবস্থাগত ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি বিশেষভাবে অস্বস্তিকর, কারণ দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেকে শুধু শক্তিধর রাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক শৃঙ্খলার উৎস হিসেবেও তুলে ধরেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন শক্তি ক্রমে শৃঙ্খলার বদলে বিশৃঙ্খলার উৎপাদক হিসেবেও দেখা পড়তে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে

স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কতটা

বর্তমান বিরতিকে কৌশলগত সমাধান বলা কঠিন; এটি অনেক বেশি একটি সাময়িক থামা। হোয়াইট হাউসের অবস্থান পরিবর্তন ছিল খুবই দ্রুত ও আকস্মিক। কিছুদিন আগেও বক্তব্য ছিল প্রায় বিপর্যয়মূলক সুরে, আর অল্প সময়ের মধ্যে তা গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যৎ সমঝোতার ভাষায় রূপ নেয়। সাধারণত এমন বৈপরীত্য বোঝায়, আগের পরিকল্পনা হয় ব্যর্থ হয়েছে, নয়তো তা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আলোচনার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ঘটনাকে সফল চাপ প্রয়োগের ফল হিসেবে দেখাতে, আর তেহরান জোর দিচ্ছে—যুদ্ধবিরতি মানে তাদের সার্বভৌম অবস্থান থেকে সরে আসা নয়, কিংবা আগ্রাসী পক্ষ সঠিক ছিল তা মেনে নেওয়াও নয়।

বিরতির ব্যাখ্যা নিয়েও লড়াই চলছে। খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেটিকে তারা স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। এর কিছু শর্ত অতীতে ওয়াশিংটন নাকচ করেছিল। কিন্তু এমন একটি প্রস্তাব এখন আলোচনায় আছে—এই সত্যটাই দেখায়, সংঘাত থামানোর কাঠামো নিয়ে কথা বলতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে, আর ইরানও নিজের শর্ত উত্থাপনের অবস্থানে এসেছে।

দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থাহীনতা এত গভীর যে, মধ্যস্থতাকারী ছাড়া আলোচনা এগোনো কঠিন। প্রত্যেকেই চায় এমন একটি নমনীয় সূত্র, যা বাস্তবে গ্রহণ করা যায়, কিন্তু প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান ছাড়তে না হয়। ওয়াশিংটন চায় বিরতিকে শক্তির ফল হিসেবে দেখা হোক, তেহরান চায় এটিকে সহনশীলতা ও সফল প্রতিরোধের ফল হিসেবে তুলে ধরতে। এই ব্যাখ্যার লড়াইটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

দুই পক্ষের বিপরীত লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো নৌপথের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা, ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা কমানো এবং এমনভাবে আলোচনা সাজানো, যাতে ঘরোয়া রাজনীতিতে বলা যায়—প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসও চায় না এই সংঘাত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত যুদ্ধে পরিণত হোক।

অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের দৃঢ়তার রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে, নতুন হামলার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা পেতে, সাময়িক বিরতিকে যাতে নতুন চাপের প্রস্তুতিপর্বে পরিণত না করা যায় তা নিশ্চিত করতে, এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কিছু শর্ত অন্তত নিজেরাও নির্ধারণ করতে। ফলে এই সংঘাত দ্রুত মুছে যাওয়ার মতো নয়। এখানে শুধু কারিগরি ব্যবস্থাপনা নয়, কী ঘটেছে তার অর্থ নিয়েও দ্বন্দ্ব চলছে। এক পক্ষ বলপ্রয়োগের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে চায়, আর অন্য পক্ষ কার্যত তার সীমা দেখিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান : বন্ধু থেকে যেভাবে হয়ে ওঠে চিরশত্রু | দৈনিক নয়া দিগন্ত

ইসরায়েল প্রসঙ্গ

ইসরায়েল সরাসরি হামলাকারী এবং চাপের অভিযানের সক্রিয় অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের ভূমিকা কিছুটা আড়ালে চলে গেছে, কারণ ট্রাম্পের তীব্র বক্তব্য ও আলটিমেটাম আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহে ইসরায়েল প্রসঙ্গকে ছাপিয়ে গেছে। ফলে নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে সমালোচনার কেন্দ্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছেন, যখন সেটিই তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের মনোযোগ যখন কেন্দ্রীভূত, তখন ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে দখল, ধ্বংস এবং সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। এতে বোঝা যায়, বড় আকারের এক সংকটের আড়ালে ইসরায়েলের অন্যান্য পদক্ষেপ কত সহজে আন্তর্জাতিক নজরের বাইরে চলে যেতে পারে, যদিও অঞ্চল অস্থিতিশীল করার প্রধান উৎসগুলোর একটি তারা নিজেই।

যদি এই বিরতি বাস্তবে লেবানন পর্যন্ত না বাড়ে, তবে যুদ্ধ সত্যিকার অর্থে শেষ হয়নি; কেবল আংশিকভাবে নতুন বিন্যাস নিয়েছে। এক ফ্রন্ট সাময়িক ঠান্ডা, আরেকটি সক্রিয়; এবং দুই ফ্রন্ট আবারও একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। এটাই সাময়িক বিরতির সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। কৌশলগত শান্তি মানে নতুন ভারসাম্য ও নতুন ব্যবস্থা। এখানে তার কিছুই তৈরি হয়নি। কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে উত্তেজনা ত্যাগ করেনি। কোনো নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতাও স্থির হয়নি। সংঘাত থেমেছে, কিন্তু কাটিয়ে ওঠা যায়নি।

শেষ হিসাব

এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আমেরিকান কৌশলের একটি কাঠামোগত ভুলকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাপের নীতি ছাড়েনি, কিন্তু তাদের মানতে হয়েছে—এই পর্যায়ের চাপ প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল দেয়নি। ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানের সহনশীলতাকে, তাদের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাত্রাকে, বৈশ্বিক বাজারের সংবেদনশীলতাকে, মিত্রদের উদ্বেগকে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকিকে কম করে দেখেছিল। সেই কারণেই দ্রুত সংকটকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও মধ্যস্থতাপূর্ণ আলোচনার কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে।

ইরানের জন্য, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও, এই পর্বটি রাজনৈতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। এই কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব সম্ভবত বিশ্বদৃষ্টির পরিবর্তনে মাপা হবে। বিশ্ব দেখেছে, ওয়াশিংটন এখনো বড় আঞ্চলিক বিপর্যয়ের কিনারায় পরিস্থিতি ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও দেখেছে, আগের মতো নিশ্চিত গতি ও আত্মবিশ্বাসে সামরিক উত্তেজনাকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক শৃঙ্খলায় রূপান্তর করা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজ নয়।

বিশ্ব আরও দেখেছে, ইরানকে গুরুতরভাবে আঘাত করা যায়, কিন্তু সহজে ভাঙা যায় না। এবং যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাপিয়ে দিলেও, ইরান এমনভাবে সাড়া দিয়েছে যে বহু সমাজের চোখে তারাই সহনশীলতা, উদ্যোগ এবং কৌশলগত স্থিরতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণেই বর্তমান বিরতিকে অনেকের কাছে আমেরিকান শক্তির বিজয় নয়, বরং তার সীমারেখা উন্মোচিত হওয়ার মুহূর্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।