কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলে জ্বালানি সংকট এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তেলের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে মোটরসাইকেল, আর সেই সঙ্গে থেমে গেছে শত শত চালকের জীবিকা। একসময় যাদের আয়েই চলত সংসার, এখন তারা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা চালকরা
শুলকুর বাজার এলাকার মোটরসাইকেল চালক আলম মিয়া জানান, প্রায় ১৭ বছর ধরে এই পেশায় ছিলেন তিনি। আগে প্রতিদিন ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। কিন্তু এখন তেল না থাকায় মোটরসাইকেল বন্ধ, আয়ও শূন্য। বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যেতে হচ্ছে অনেককে। কেউ দিনমজুর হচ্ছেন, কেউ খুঁজছেন সাময়িক কাজ।
চরাঞ্চলের একমাত্র ভরসা ছিল মোটরসাইকেল
কুড়িগ্রামের অধিকাংশ চর এলাকা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। এসব এলাকায় যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেলই ছিল প্রধান মাধ্যম। কোথাও ঘোড়ার গাড়ি থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় মোটরসাইকেল ছাড়া বিকল্প নেই। তাই জ্বালানি সংকটে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।

বাড়ছে ভাড়া, কমছে যাত্রী
তেল সংকটের কারণে হাতে গোনা কয়েকটি মোটরসাইকেল চলাচল করছে। ফলে চালকরা আগের তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া দাবি করছেন। এতে যাত্রীসংখ্যা কমে গেছে। আগে যেখানে ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় যাতায়াত সম্ভব ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে প্রতি যাত্রীর জন্য।
দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল
চালকদের অভিযোগ, পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কখনও ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।
পরিবার চালাতে হিমশিম
কালীগঞ্জ এলাকার চালক আবু হানিফ বলেন, তার চারজনের সংসার পুরোপুরি নির্ভর করত মোটরসাইকেলের আয়ের ওপর। এখন আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাগেশ্বরীর চর নারায়ণপুরের চালক মাঈদুল ইসলাম জানান, সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি চরম সংকটে আছেন। প্রায় ১২ দিন ধরে কোনো আয় নেই, ধারদেনা করে দিন কাটাতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে
কলেজপড়ুয়া আরিফ হোসেন বলেন, আগে মোটরসাইকেলে সহজে কলেজে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু এখন তেল সংকটে গাড়ি কমে যাওয়ায় ভাড়া বেড়ে গেছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরবরাহের ঘাটতি মূল কারণ
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক বিপুল পরিমাণ জ্বালানির চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। ফলে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
সমাধানের অপেক্ষায় মানুষ
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। যোগাযোগ, আয়-রোজগার এবং দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















