যুদ্ধের ঝড় থেমে গেলে সবাই তাকিয়ে থাকবে—কোন দিকে হাওয়া বইছে। এই পরিবর্তনের দিকে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে উপসাগরীয় দেশগুলো, তবে এর প্রভাব পড়বে সবার ওপর।
যদি তেহরানের সরকার টিকে যায়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা পুনর্গঠন করে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধরে রাখে, তবে বোঝা যাবে—এই যুদ্ধে কে জিতল এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। আর যদি সরকার ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসর কমাতে রাজি হয় এবং পারমাণবিক পরিদর্শকদের জন্য দরজা খুলে দেয়, তবে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।
প্রথম পরিস্থিতি হলে তা হবে ইরানের প্রধান সমর্থক চীনের জন্যও বিজয়। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বর্তমান সমস্যাই আরও জটিল হয়ে উঠবে। নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা এবং অর্থনীতির জন্য চীনের ওপর নির্ভরতার মধ্যে যে টানাপোড়েন, তা আরও তীব্র হবে।
গত এক দশকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশ ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতি অনুসরণ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে থাকলেও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে, যা পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলো দিয়ে যায়। ছয় দেশের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও বেশি বাণিজ্য করে চীনের সঙ্গে। চীন সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, এবং এই সম্পর্ক শুধু জ্বালানি নয়—এর মধ্যে রয়েছে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক ড্রোন কেনাও।

ফেব্রুয়ারি ২৮-এ যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলো আশা করেছিল তারা রক্ষা পাবে। তারা ওয়াশিংটনকে আক্রমণ না করতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল এবং নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি। কিন্তু তারা দেখল, ইরান কতটা ভয়াবহ হামলা চালাতে পারে। বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, ডেটা সেন্টার, আবাসিক ভবন ও হোটেল—সবই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতেই দুই হাজারের বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়।
প্রথম দুই সপ্তাহের পর সৌদি আরব ও আমিরাত নাকি গোপনে ওয়াশিংটনকে জানায়—সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত। এখন তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ফিরে যাবে এবং তারা একা হয়ে পড়বে—একটি আক্রমণাত্মক ইরানের মুখোমুখি।
উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তিতে নেই। তারা দেখেছে, সতর্ক কূটনীতি তাদের রক্ষা করতে পারেনি। গত ছয় সপ্তাহে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটনের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে তাদের সুনাম ভেঙে পড়েছে। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহের কথায়, অঞ্চলটি ‘ইরান পরিচালিত ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার’ শিকার হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ইরান শক্ত অবস্থানে ছিল। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী ছিল, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো ব্যস্ত ছিল এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোচ্ছিল।

তিনটি ঘটনা পরিস্থিতি বদলে দেয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যর্থ আক্রমণের কারণে সিরিয়ায় তাদের বাহিনী কমে যায়। হামাসের হামলার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে আক্রমণ চালায়, যার জবাবে তাদের যোদ্ধাদের বড় অংশ লেবাননে ফিরে যায়। এতে সিরিয়ায় বিরোধী গোষ্ঠীগুলো এগিয়ে যায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পরিস্থিতি বুঝে ইরানে ফিরে যায়, আর আসাদ মস্কোতে পালিয়ে যান। তেহরান থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইরানের করিডোর ভেঙে পড়ে।
তৃতীয় ঘটনা ছিল ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরোধী। তার প্রথম মেয়াদে তিনি ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয় এবং এ বছর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে।
এই যুদ্ধে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়েছে, অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতাও কমেছে। তবে এগুলো পুনর্গঠন সম্ভব। ইরান হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে—ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে দ্রুত গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনই সেরা উপায়।
এতে উপসাগরীয় দেশগুলো কঠিন অবস্থায় পড়বে। সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, তারা চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, যাতে বেইজিং ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করে।
চীন এমন একটি বিশ্ব চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবশালী শক্তি নয়। তারা নিজেদেরকে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বাস্তবতা হলো—ইরানের হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই উপসাগরীয় দেশগুলোকে রক্ষা করেছে।

চীনের আগ্রহ মূলত অর্থনৈতিক, সামরিক নয়। তাদের পর্যাপ্ত সামরিক অবকাঠামোও নেই। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিস্তৃত ঘাঁটি, উন্নত রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে আসা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই কারণে ক্ষোভ থাকলেও স্বল্পমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই থাকবে। তবে তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে।
সাম্প্রতিক হামলা তাদের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও ঠেলে দিতে পারে। বহু বছর ধরে এ নিয়ে আলোচনা হলেও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসের কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু এখন তারা বুঝছে—তথ্য ভাগাভাগি, যৌথ বিমান শক্তি এবং সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
অন্য প্রতিরক্ষা অংশীদার খোঁজাও গুরুত্ব পাবে। সৌদি আরবের পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, আমিরাতের রয়েছে ভারত ও ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক, আর কাতারে তুরস্কের ঘাঁটি রয়েছে।
ইসরায়েলও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তবে রাজনৈতিক কারণে বেশিরভাগ দেশ তা গ্রহণযোগ্য মনে করে না, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান না হলে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে—কে জিতল, কে হারল। সংক্ষিপ্ত উত্তর—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। প্রাণহানি, আহত এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের সরকার টিকে থাকলেও বড় আঘাত পেয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে গেছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়েছে। তবুও বিশ্বমঞ্চে তারা শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আবারও প্রমাণিত হয়েছে। তবে এই যুদ্ধ দেখিয়েছে—হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সস্তা রকেটও বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। রাশিয়া তেলের দাম বাড়ায় লাভবান হলেও ইরানকে যথেষ্ট সহায়তা করতে পারেনি। চীন স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে।
পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এই যুদ্ধ ইউরোপকেও ভাবতে বাধ্য করছে—তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কী হবে। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বৈশ্বিক নিরাপত্তা দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর দায়িত্ব দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের পর হিসাব-নিকাশ শুরু হবে, এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো ইউরোপকেও নিজেদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
পরিবর্তনের হাওয়া ইতিমধ্যেই বইতে শুরু করেছে।
টিম মার্শাল 



















