গত সপ্তাহে অ্যানথ্রপিক ঘোষণা দেয় যে তাদের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ‘ক্লড মিথোস প্রিভিউ’ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। কারণ, তারা জানতে পেরেছে এই মডেলটি এমন সব গুরুতর সফটওয়্যার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে এবং কাজে লাগাতে সক্ষম, যা কয়েক দশক ধরে অজানা ছিল। এর পরিবর্তে, ‘মিথোস’ এবং এটি ব্যবহারের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সুবিধা বিশ্বের ৫০টিরও বেশি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, গুগল এবং জেপিমরগান চেজ। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’, যার লক্ষ্য সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।

এই ঘোষণার আগেই দেখা গেছে, উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো সাধারণ সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারছে। গবেষকদের মতে, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আগামী ৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে একই ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই সক্ষমতা এবং এর ঝুঁকি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। ফলে স্ট্রিমিং সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, এমনকি সাধারণ তথ্য অনুসন্ধান ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যদি এই পরিস্থিতির মোকাবিলা দ্রুত ও সঠিকভাবে না করা হয়, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সফটওয়্যার তৈরির সুবিধা যারা পাচ্ছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। তাদের নিজেদের মতো করে টিকে থাকার জন্য ছেড়ে দিলে, আমরা যে ইন্টারনেটকে চিনি, তা ভেঙে পড়তে পারে।
এখন ‘ভাইব কোডিং’ নামে একটি নতুন ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে মানুষ সহজ ভাষায় নিজের প্রয়োজন জানিয়ে সফটওয়্যার তৈরি করতে পারছে। একজন দোকানদার তার পণ্যের হিসাব রাখার জন্য একটি সিস্টেম তৈরি করছেন, একজন চিকিৎসক রোগীদের জন্য অনলাইন সেবা তৈরি করছেন। যেসব মানুষ কখনো নিজেদের সফটওয়্যার ডেভেলপার ভাবেননি, তারাও এখন প্রথমবারের মতো সফটওয়্যার তৈরি করছেন। কিন্তু এসব সফটওয়্যার সাধারণত কোনো নিরাপত্তা যাচাই ছাড়াই তৈরি হচ্ছে। ফলে ত্রুটি থাকলে সহজেই ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি, অ্যাকাউন্ট দখল বা পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটের নিরাপত্তা কিছুটা হলেও বজায় ছিল দুটি কারণে। প্রথমত, সফটওয়্যার তৈরি করা কঠিন ছিল, তাই এটি করতেন প্রশিক্ষিত ও সীমিত সংখ্যক মানুষ। দ্বিতীয়ত, সফটওয়্যারের ত্রুটি খুঁজে বের করাও কঠিন ছিল, ফলে অনেক বড় সমস্যা বছরের পর বছর অজানা থেকে যেত। এটি আদর্শ ব্যবস্থা ছিল না, তবে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় ছিল।
এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যে কেউ সহজেই কোড লিখতে পারছে। শিগগিরই খারাপ উদ্দেশ্যের মানুষরাও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারবে। সেই পুরোনো ভারসাম্য এখন শেষ হয়ে গেছে।

ইন্টারনেটের বড় অংশ ওপেন সোর্স সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনলাইনে যে ভিডিও আমরা দেখি, তার অনেকটাই একটি বিনামূল্যের ওপেন সোর্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, যা স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আবার গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক সুরক্ষায় ব্যবহৃত একটি অপারেটিং সিস্টেমও দানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বড় কোম্পানির মালিকানাধীন সফটওয়্যারের মতো নয়, এসব প্রকল্প গড়ে উঠেছে মানুষের আগ্রহ ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে।
অ্যানথ্রপিকের মতে, ‘মিথোস’ একটি ২৭ বছর পুরোনো দুর্বলতা এবং একটি ১৬ বছর পুরোনো ত্রুটি শনাক্ত করেছে। এগুলো এমন কোডের মধ্যে লুকানো ছিল, যা আগে বহুবার পরীক্ষা করা হলেও ধরা পড়েনি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে এসব সমস্যা সমাধান করেছে। এমনকি একটি জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজারেও দেখা গেছে, আগের মডেল যেখানে খুব কমবার সফল হয়েছিল, সেখানে ‘মিথোস’ প্রায় প্রতিবারই সফল হয়েছে। এই মডেল হাজার হাজার দুর্বলতা শনাক্ত করেছে, যেগুলো বড় ধরনের সাইবার হামলার কারণ হতে পারে।
এই প্রযুক্তি শুধু কোডের ত্রুটি নয়, ইন্টারনেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাঠামোকেও উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ডেভেলপাররা নিজেদের কাজ উন্মুক্তভাবে ভাগাভাগি করবেন এবং একে অপরকে সাহায্য করবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে।
যে প্রোগ্রামার বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার ঠিক করে আসছেন, তিনি যেমন ঝুঁকিতে আছেন, তেমনি নতুন ব্যবহারকারীরাও। তাদের কারও কাছে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, এমনকি এই উন্নত প্রযুক্তিরও সহজ প্রবেশাধিকার নেই।
অ্যানথ্রপিক দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে তাদের কার্যক্রম কিছুটা ধীর করেছে এবং ওপেন সোর্স নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য অর্থ সহায়তা ঘোষণা করেছে। তবে মূল সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার অবকাঠামো এখনো এমন মানুষের ওপর নির্ভরশীল, যারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। অথচ বড় কোম্পানিগুলো এই অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিপুল আয় করছে।

এখন নতুন প্রযুক্তি এসেছে, এবং আশঙ্কা রয়েছে যে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই আগে এর সুবিধা পাবে এবং নিজেদের নিরাপদ করবে, আর অন্যরা ঝুঁকিতে পড়ে থাকবে।
যারা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাদের এই প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়া উচিত। এসব প্রকল্প পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো জানে কারা এই কাজ করছেন এবং তাদের কাছে পৌঁছানোর উপায়ও আছে।
তবে নতুন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তাদের এমন শক্তিশালী প্রযুক্তির প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়। বরং তারা যে সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন, সেগুলো শুরু থেকেই নিরাপদ হওয়া উচিত।
তাই এখন সময় এসেছে নিয়ম পরিবর্তনের। যেসব কোম্পানি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের উচিত এই সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সহায়তা করা। শুধু অর্থ নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তা, দক্ষতা এবং জনবল দিয়েও সহায়তা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর উচিত তাদের উন্নত সরঞ্জাম এসব মানুষের হাতে তুলে দেওয়া।
একই সঙ্গে নতুন যারা সফটওয়্যার তৈরি করছেন, তাদের জন্য নিরাপদভাবে কাজ করা সহজ করতে হবে। যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোড তৈরি করে, সেটিকেই কোডের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। এটি যেন অতিরিক্ত সুবিধা না হয়ে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হয়।
পুরোনো ভারসাম্য শেষ হয়ে গেছে। দুর্বলতাগুলো এখন স্পষ্ট। নির্মাতার সংখ্যা বাড়ছে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সবাইকে সুরক্ষা দেব, নাকি শুধু তাদেরই, যারা নিজেদের সুরক্ষা কেনার সামর্থ্য রাখে।
রাফি ক্রিকোরিয়ান 



















