বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক, প্রায় ৮৯ শতাংশ, অন্তত একবার হলেও অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন—এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে একটি জাতীয় পরামর্শ সভায়। দ্রুত বিস্তৃত ডিজিটাল পরিসরে প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
ডিজিটাল বিস্তারে নতুন ঝুঁকি
“ডিজিটাল উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রতিক্রিয়া: প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ ও দ্রুততর করলেও এর অপব্যবহার নতুন ধরনের সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, তথ্য ফাঁস, সাইবার হয়রানি ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য এখন বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
জাতীয় পর্যায়ের এই আলোচনা ঢাকায় একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নীতিনির্ধারক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে
আলোচনায় বলা হয়, নারী, কিশোরী এবং লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষই অনলাইন সহিংসতার সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
২০২৪ সালের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের ৮৯ শতাংশই জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।

সমস্যার জটিলতা ও করণীয়
বক্তারা বলেন, ডিজিটাল যুগে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ধরন ক্রমেই জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। তাই এই সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রতিরোধ, সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিকার এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা, বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও সেবা প্রদানকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা
আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট কমাতে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও উঠে আসে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযোগী স্থানীয় সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
অনলাইন সহিংসতার বিভিন্ন রূপ
প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মধ্যে রয়েছে সাইবার অনুসরণ, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ছবি ব্যবহার করে অপমান, শিশু প্রলোভন, প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক ঘৃণাত্মক বক্তব্য।
অভিযোগ ও বাস্তবতা
একজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা জানান, গত বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট অপসারণের জন্য ১৩ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে, যার মধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী।
তিনি বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে পরিবার থেকেই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

আইন আছে, সচেতনতা কম
সরকারি এক কর্মকর্তা জানান, প্রযুক্তিনির্ভর এই সহিংসতা মোকাবিলায় দেশে একাধিক আইন থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব আইনের সম্পর্কে সচেতনতা এখনও কম। ফলে অনেক ভুক্তভোগী সঠিকভাবে আইনি সহায়তা নিতে পারেন না।
ডক্সিং ও মানসিক প্রভাব
আলোচনায় আরও বলা হয়, নারীরা প্রায়ই ‘ডক্সিং’-এর শিকার হন, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়াই প্রকাশ করে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়। এই ধরনের সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রশাসনিক ও সামাজিক—দুই স্তরেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















