দেশের স্বাস্থ্যখাতে টিকা ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সরবরাহে ঘাটতি ও কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
টিকা সংকট ও কার্যক্রম ব্যাহত
অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১টি রোগের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। এতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে আরও ১৫টি রোগের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিশুদের টিকাদান কাঠামো
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বিভিন্ন বয়সে মোট সাত ধরনের টিকা দেওয়া হয়, যা ১১টি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এর মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মার জন্য বিসিজি, নিউমোনিয়ার জন্য পিসিভি, হাম ও রুবেলার জন্য এমআর, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি এবং রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার জন্য মুখে খাওয়ার টিকা।
এ ছাড়া পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি এবং হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। পোলিও নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি—এই দুই ধরনের টিকা প্রয়োগ করা হয়।

অব্যবস্থাপনার প্রভাব
গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং সমন্বয়ের অভাবে রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনস্বাস্থ্য খাতে বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
ওপি বন্ধে স্থবিরতা
১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাসহ ৩৮টি কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল।
২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ পর্যায়ের কর্মসূচি শেষ হলেও পরবর্তী কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই অপারেশন প্ল্যান হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। গত দুই বছরে সীমিতসংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ায় পুরো কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর।

রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে ধস
অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকার ফলে হাম-রুবেলা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, হেপাটাইটিস, অ্যানিমিয়া, কালাজ্বর, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, টাইফয়েড, পোলিও, এইচআইভি, ডিপথেরিয়া ও নিউমোনিয়াসহ ২৬টি রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
এতে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
টিকাদানে নতুন জটিলতা
অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতেও। আগে আন্তর্জাতিক সহায়তায় সহজ প্রক্রিয়ায় টিকা সংগ্রহ করা হলেও নতুন সিদ্ধান্তে নিজস্ব ব্যবস্থায় টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা জটিলতা তৈরি করে।

পরে আবার আগের ব্যবস্থায় ফেরার চেষ্টা হলেও বিলম্বের কারণে টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত থাকলে ধীরে ধীরে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশে হামের বিস্তার দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতির ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এজন্য টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং সমন্বিতভাবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্গঠন জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















