যুদ্ধবিরতির মাঝেই হঠাৎ করে আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও চলমান আলোচনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই আলোচনায় অগ্রগতির দাবি করলেও বাস্তবে পারমাণবিক ইস্যু ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদ এখনো গভীর।
আলোচনায় অগ্রগতি, কিন্তু মতভেদ রয়ে গেছে
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় দূরত্ব রয়েছে। কিছু বিষয়ে ইরান অনড় অবস্থানে রয়েছে, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরও নিজস্ব সীমারেখা আছে। তবে মতভেদের সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে “খুব ভালো আলোচনা” চলছে, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি।

হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন, প্রণালী আবার বন্ধ
শনিবার ইরান আবার হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কড়া করে এবং তা কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর আগে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে প্রণালী খুলে দেওয়া হয়েছিল।
ইরান জানায়, তাদের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অবরোধের প্রতিক্রিয়া। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে ইরানের নৌবাহিনী শত্রুদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে “চাঁদাবাজি” হিসেবে আখ্যা দেন, তবে একই সঙ্গে আলোচনার প্রশংসাও করেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
প্রায় আট সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন পর্যন্ত। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধবিরতি ও নতুন সংঘাতের শঙ্কা
বর্তমান যুদ্ধবিরতি কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। এর আগে স্থায়ী সমাধান না হলে আবার হামলা শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প।
ইরান জানিয়েছে, প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার খরচ আদায় করা হবে।
জাহাজে হামলা, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
শনিবার অন্তত দুটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারত জানিয়েছে, তাদের পতাকাবাহী দুটি জাহাজ এই হামলার শিকার হয়েছে এবং এ নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর সমুদ্র অবরোধ কার্যকর রাখছে, তবে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তেল ও গ্যাস সরবরাহে ঝুঁকি
ইরানের এই পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে।

এদিকে, প্রণালী খুলে দেওয়ার সম্ভাবনায় আগের দিন তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমেছিল এবং বিশ্ববাজারে শেয়ারের দাম বেড়েছিল। তবে এখনো শত শত জাহাজ ও প্রায় ২০ হাজার নাবিক উপসাগরে আটকে রয়েছে।
পারমাণবিক আলোচনা: বড় ফারাক
ইসলামাবাদে সর্বশেষ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়। বিপরীতে, ইরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য স্থগিতের প্রস্তাব করে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদে জানিয়েছেন, পরবর্তী বৈঠকের কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। আগে একটি সমঝোতার কাঠামো ঠিক করতে হবে।
রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও চাপ বাড়ছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বাড়তি মূল্যস্ফীতি এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর সমাধান খোঁজার চাপ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত থাকলেও হরমুজ প্রণালী ও পারমাণবিক ইস্যু ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে আসন্ন কয়েক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















