রাজধানীর ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে এখন এক ধরনের ক্লান্তি আর অসহায়তার ছাপ। কারও হাতে খাবারের ব্যাগ নেই, কারও পকেটে টাকার হিসাব মিলছে না—এক ফোঁটা জ্বালানি পেতে গিয়ে যেন পুরো জীবনের হিসাবই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তরিকুল ইসলামের মতো হাজারো মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—আজ কি বাজার হবে, নাকি বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা যাবে?
লাইনে দাঁড়িয়ে থমকে গেছে জীবন
পরিবাগ, মতিঝিল, মহাখালী—রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের সামনে একই দৃশ্য। সকাল থেকে রাত—৮, ১০, এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাওয়া অনিশ্চিত। কেউ কেউ বলছেন, এই অপেক্ষা যেন ঈদের ভিড়ের মতো দীর্ঘ ও কষ্টকর, তবে আনন্দের বদলে এখানে আছে শুধু অনিশ্চয়তা।
একজন রাইডশেয়ার চালক সকাল ৭টায় লাইনে দাঁড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত তেল পাননি। আরেকজন ১১ ঘণ্টা পর তেল পেয়ে বলছেন, “এই অভিজ্ঞতা ঈদযাত্রার মতো”—কিন্তু এতে নেই ঘরে ফেরার আনন্দ, আছে শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
আয় কমে জীবিকা হুমকির মুখে

জ্বালানির এই সংকট সরাসরি আঘাত করেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ওপর। যারা প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় করতেন, তারা এখন দিনভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও আয় করতে পারছেন না।
অতিরিক্ত খরচও বেড়েছে—পানি, খাবার, অপেক্ষার খরচ মিলিয়ে প্রতিদিন ৩০০ টাকার মতো চলে যাচ্ছে। ফলে আয় কমে গিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছেন, দোকানে বাকি করছেন, এমনকি বাড়িভাড়া দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
সংসারের ভেতরে বাড়ছে চাপ
জ্বালানি সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি পারিবারিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী যখন দিনে আয় করতে পারছেন না, তখন বাজার আর ওষুধের মধ্যে বেছে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
অনেক চালক জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহে তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। কেউ কিস্তিতে কেনা মোটরসাইকেলের টাকা দিতে পারছেন না, কেউ আবার সংসারের খরচ চালাতে ধার করছেন।
প্রতিযোগিতা আর নতুন চাপ
সংকটের মধ্যে নতুন আরেকটি চাপ তৈরি করেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কম খরচে চলায় তারা কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছে, ফলে মোটরসাইকেল চালকদের আয় আরও কমে গেছে। আগে যেখানে ৩০০ টাকার ভাড়া পাওয়া যেত, এখন সেটি ১৫০ টাকায় চলে যাচ্ছে।

এই প্রতিযোগিতার কারণে অনেক চালক যাত্রী পাচ্ছেন না, ফলে তাদের আয়ের পথ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ লাইন, স্থবির শহর
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শত শত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। কোথাও ৭০০-র বেশি মোটরসাইকেল, কোথাও ৪০০-র বেশি গাড়ি অপেক্ষায়—এ যেন এক অচল নগরীর প্রতিচ্ছবি।
এই দীর্ঘ লাইনের কারণে শহরের যান চলাচলেও প্রভাব পড়ছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে, আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হয়ে উঠছে আরও কঠিন।
সংকটের সুযোগে টিকে থাকার লড়াই
এই সংকটের মধ্যেও কিছু মানুষ নতুনভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। ফিলিং স্টেশনের পাশে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বসিয়ে কেউ কেউ আয় করছেন। রুটি, কলা, চা—এই সাধারণ খাবারই এখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভরসা।

তবে এই ক্ষুদ্র আয়ের পেছনেও লুকিয়ে আছে বড় এক বাস্তবতা—সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সমাজের ভেতরে বৈষম্য ও কষ্ট বাড়ছে।
মানবিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে পরিস্থিতি
জ্বালানি সংকট এখন শুধু অর্থনীতি বা সরবরাহের সমস্যা নয়—এটি মানুষের জীবনের মৌলিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিচ্ছে। কাজ, আয়, পরিবার—সবকিছুই এক অদৃশ্য চাপে আটকে যাচ্ছে।
যেখানে একটি দিনের আয়ে নির্ভর করে একটি পরিবারের খাবার ও চিকিৎসা, সেখানে ১০-১২ ঘণ্টার অপেক্ষা মানে শুধু সময় নষ্ট নয়—এটি একটি দিনের জীবন থেমে যাওয়া।
বাংলাদেশের এই জ্বালানি সংকট তাই ধীরে ধীরে মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে—যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই মানুষগুলো, যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর বেঁচে থাকেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















