মার্চের শেষদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়া, জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হওয়া এবং মার্কিন সেনাদের মৃতদেহ দেশে ফিরতে থাকায় ট্রাম্প উপলব্ধি করেন—এমন পরিস্থিতিতে বেইজিং সফর করা রাজনৈতিকভাবে ঠিক হবে না। ১৬ মার্চ তিনি সফরটি মে মাস পর্যন্ত স্থগিত করেন। মাত্র আট দিন আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় এই সংকটের সংঘর্ষ তিনি অনুমান করতে পারেননি—এটি তার প্রশাসনের একাধিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়ার অক্ষমতাকে স্পষ্ট করে।
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হিসেবে শাসন পরিবর্তন থেকে শুরু করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার কথা বলা হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও চীন নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়ে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ায় পূর্ব এশিয়ায় চীনের কৌশলগত সুযোগ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও অনিশ্চিত আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর চীন নিজেকে দায়িত্বশীল শান্তিপ্রিয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।
যখন ট্রাম্প-শি বৈঠক শেষ পর্যন্ত হবে, তখন শি জিনপিং শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনায় বসবেন। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পদ নষ্ট করেছে, সেখানে চীন তার লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি নিয়েছে। দুর্বল অবস্থানে থাকা ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ছাড় দিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের প্রভাব
ইরানে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার নিরাপত্তা ছাতার শক্তি কমিয়েছে, যা চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। পূর্ব এশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী জাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্র দেশগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও এই সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের পরিবর্তনকে স্পষ্ট করেছে। এতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থাও কমেছে।
এই যুদ্ধ চীনের জন্য আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার। অস্ত্র ব্যবহারের ধরন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে বেইজিং, যা ভবিষ্যতের সংঘাতে কাজে লাগানো যেতে পারে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ট্রাম্প চীনসহ অন্যান্য দেশকে প্রণালী খোলা রাখতে নৌবাহিনী পাঠাতে আহ্বান জানান—যা কার্যত চীনকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়।
প্রভাব বিস্তারে চীনের কৌশল
এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে। অতীতে ইরান-সৌদি আরব বা কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড বিরোধে তারা এমন ভূমিকা পালন করেছে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতেও চীনের ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। একইসঙ্গে, তারা নিজেদের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমিয়ে বৈশ্বিক দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছে।
চীনের জন্য কিছু সমস্যা তৈরি হলেও—যেমন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা কৃষি খাতে চাপ—তাদের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, কয়লাভিত্তিক উৎপাদন এবং বিপুল মজুত তাদের এই সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করছে। বিশ্বের মোট বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই চীনের হাতে।
চীনের বিশাল তেল মজুত তাদের দীর্ঘ সময় জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম করে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিকল্প পথও রয়েছে। এমনকি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য চীনা মুদ্রায় লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে, যা তাদের মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। বরং এটি সম্পদ ক্ষয় করেছে, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও ফাটল ধরিয়েছে, যা ভবিষ্যতে চীনের প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি প্রতিস্থাপন না করেও লাভবান হতে পারে। শুধু স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় অংশীদার হিসেবে থাকলেই তারা মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াতে পারবে। পুনর্গঠন প্রকল্প, অবকাঠামো বিনিয়োগ—এসবের মাধ্যমে তারা দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কার লাভ
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান থাকা সত্ত্বেও এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদে ফেলেছে। পরিকল্পনাহীন এই সামরিক পদক্ষেপ দেশটিকে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ফেলেছে। বিপরীতে, চীন ধীরে ধীরে নিজেদের প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠকে চীন সম্ভাব্য বড় অর্থনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সবশেষে, এই সংঘাতে প্রকৃত বিজয়ী ওয়াশিংটন বা তেহরান নয়—বেইজিং। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বিশ্বে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে চীন তাদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
মাইকেল ক্লার্ক 



















