দীর্ঘ তিন দশকের বন্দিজীবন পেরিয়ে অবশেষে আইনজীবীর কালো কোট গায়ে তুলেছেন রাজীব গান্ধী হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত এ জি পেরারিভালন। কারাগারের সাদা পোশাক থেকে আদালতের কালো গাউন—এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত পরিবর্তনের নয়, বরং বিচারব্যবস্থার ভেতরে পুনর্বাসনের সম্ভাবনার এক জোরালো উদাহরণ হিসেবেও সামনে এসেছে।
দীর্ঘ কারাবাস থেকে মুক্তি
১৯৯১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হন পেরারিভালন। অভিযোগ ছিল, বিস্ফোরক যন্ত্রে ব্যবহারের জন্য একটি ব্যাটারি সরবরাহ করেছিলেন তিনি। প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তা যাবজ্জীবনে পরিবর্তিত হয়। প্রায় ৩১ বছর কারাগারে কাটানোর পর ২০২২ সালে সর্বোচ্চ আদালতের বিশেষ ক্ষমতায় তিনি মুক্তি পান।
এই দীর্ঘ সময়ে মানসিক চাপ, আইনি লড়াই এবং পরিবারের নিরলস প্রচেষ্টাই ছিল তার ভরসা। বিশেষ করে তার মায়ের অবিরাম সংগ্রাম এই মুক্তির পথকে বাস্তবে রূপ দেয়।

কারাগারেই শিক্ষা, নতুন পথের সূচনা
কারাগারে থাকাকালীনই পেরারিভালন বিভিন্ন শিক্ষায় নিজেকে যুক্ত করেন এবং পরবর্তীতে আইন পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। মুক্তির পর তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের আইনজীবী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশায় প্রবেশের সুযোগ পান।
তার মতে, নিজের আইনি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতাই তাকে আইন পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে অন্যদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চান।
আইনজীবী হিসেবে নতুন ভূমিকা
সম্প্রতি তিনি তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির আইন পরিষদে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন এবং আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। আদালতের একই প্রাঙ্গণে, যেখানে একসময় তিনি আসামি ছিলেন, এখন তিনি সওয়াল করতে দাঁড়াচ্ছেন—এই দৃশ্য নিজেই এক প্রতীকী পরিবর্তনের গল্প।
পেরারিভালন জানিয়েছেন, তিনি বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড, মানবাধিকার এবং দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা দরিদ্র বন্দিদের আইনি সহায়তার বিষয়গুলোতে কাজ করতে চান।

পুনর্বাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রশ্ন
তার এই রূপান্তর নতুন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। শাস্তির পর একজন মানুষ কি সত্যিই নতুন জীবন শুরু করতে পারে? বিচারব্যবস্থা কি শুধুই শাস্তির মাধ্যম, নাকি পুনর্গঠনের পথও তৈরি করে?
পেরারিভালনের জীবনের মাধ্যমে দেখা যায়, আইনের ভেতরেই যেমন শাস্তি আছে, তেমনি রয়েছে মুক্তি ও পুনর্গঠনের সুযোগ। একইসঙ্গে, তার মতো একজন সাবেক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি মানবাধিকার নিয়ে কথা বললে তা আরও গভীর ও বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
সমাজে নতুন বার্তা
তার এই যাত্রা তরুণদের জন্য একটি বার্তা বহন করে—আইন কেবল অপরাধ দমন করে না, বরং মানুষের জীবন বদলানোর সুযোগও দেয়। তবে এই গল্প শুধু সাফল্যের নয়, এটি বিচার, মানবাধিকার এবং অতীতের বেদনার এক জটিল সমন্বয়ও।
সবশেষে, পেরারিভালনের এই পথচলা দেখায় যে সঠিক সুযোগ ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় থেকেও নতুন আলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















