সূর্যাস্তের আলোয় রক্তিম খাড়া পাথরের ওপর সৈন্যরা নেমেছিল। মাত্র দুই কিলোমিটারেরও কম বিস্তৃত তুনব-ই কুচাক দ্বীপটি ছিল মূলত বিষধর সাপের আবাসস্থল। কিন্তু যমজ দ্বীপের বড়টি তুনব-ই বোজর্গে পরিস্থিতি এত সহজ ছিল না। শিগগিরই আমিরাত হতে যাওয়া রাস আল খাইমাহর শাসক সাকর বিন মোহাম্মদ আল কাসিমিকে ইরানি অভিযানের বিষয়ে আগেই জানানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি দ্বীপে থাকা ছয়জন পুলিশ সদস্যকে সতর্ক করেননি। গুলি বিনিময়ে তিনজন ইরানি সৈন্য নিহত হয়। পরে ইরানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে চারজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে এবং তাদের স্থাপনা, একটি স্কুল, ও কয়েকটি ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়।
১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর সকালে ইরানের সেনারা আরেকটি দ্বীপ আবু মুসা দখল করে নেয়, যা ব্রিটিশ মধ্যস্থতায় শারজাহর সঙ্গে একটি চুক্তির অংশ ছিল। তুনব-ই বোজর্গের প্রায় দেড়শ বাসিন্দাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তেহরান পার্স গ্যাসক্ষেত্রের আয় ভাগাভাগির চুক্তি করে, যা স্বাক্ষর করা ছাড়া আমিরাতগুলোর আর কোনো পথ ছিল না।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক প্রভাব বুঝতে গেলে হরমুজ প্রণালীর এই ছোট দ্বীপগুলোর ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় সংকট ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব দিয়ে শুরু হয়নি, কিংবা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই মূল সমস্যা ছিল না।
১৯৭১ সালে ব্রিটিশ শাসন ভেঙে পড়তে শুরু করলে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো বুঝতে পারে যে শুধু তেলের সম্পদ তাদের টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তখনই পাকিস্তান সামনে আসে। তারা ২২টি দেশে প্রায় ৩০ হাজার সেনা পাঠিয়ে সামরিক সহায়তা দেয় এবং এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ ও পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য তহবিল সংগ্রহ করে।
পাথরের শহর
উচ্চ আকাশ থেকে তাবুক অঞ্চলে বিশাল সামরিক স্থাপনার চিত্র ধরা পড়ে। সেখানে একটি সাঁজোয়া ব্রিগেড গঠনের মতো অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে সৌদি আরব তাদের প্রথম সাঁজোয়া ইউনিট গঠন করে। ফ্রান্স থেকে ট্যাংক ও যুদ্ধযান কেনা হলেও জনবল সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় — সেনাবাহিনী তাদের নির্ধারিত শক্তির মাত্র ৩০–৪০ শতাংশে পরিচালিত হচ্ছিল।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনারা সৌদি পোশাকে “১২তম খালিদ বিন ওয়ালিদ সাঁজোয়া ব্রিগেড” নামে দায়িত্ব নেয়। ব্রিগেডিয়ার মেহবুব আলমের নেতৃত্বে এই বাহিনীতে ট্যাংক ব্যাটালিয়ন, যান্ত্রিক পদাতিক, আর্টিলারি এবং বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ছিল। তারা বড় কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি, কিন্তু তাদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য ছিল প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা।
ভারতের বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষার জন্য পাকিস্তান বাগদাদ চুক্তিতে যোগ দেয়, যা পরে সেন্টো (CENTO)-তে রূপ নেয়। যদিও এই জোট খুব বেশি সফল হয়নি, তবে পাকিস্তানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সেবা প্রদানের সুযোগ তৈরি করে।
সৌদি আরব তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদ নতুন প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করে। ইয়েমেন ও ইরাকে রাজতন্ত্র পতনের পর ইয়েমেনের সরকার সৌদি আরবের ওপর আক্রমণ চালায়। এই সংকটে সৌদি আরব পাকিস্তানের সহায়তা চায়। পাকিস্তানি পাইলটদের পরিচালিত যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের আক্রমণ প্রতিহত করে।
একই সময়ে ব্রিটিশ শক্তি কমে আসছিল। তুনব দ্বীপে ইরানের আক্রমণ দেখেও ব্রিটিশ নৌবাহিনী হস্তক্ষেপ করেনি কারণ ইরান তখন ব্রিটিশ অস্ত্র কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।

অস্থির রাজতন্ত্র
এই সময়ে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো একের পর এক অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়। শারজাহ, আবুধাবি ও ওমানে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। সৌদি আরবেও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র দেখা দেয়।
ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি আশঙ্কা করেন, বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের ছেড়ে দিতে পারে। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর শাহ নিজেও পারমাণবিক কর্মসূচি বিবেচনা করতে শুরু করেন।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের শক্তি কমানোর চেষ্টা করে এবং একই সময়ে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থায়নের প্রমাণ সামনে আসে। তাবুকের সামরিক ঘাঁটি মূলত সৌদি শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য গড়ে ওঠে।
ছায়াযুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের পর পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালে জর্ডানে পিএলও দমনে জিয়াউল হকের ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানি পাইলটরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও অংশ নেয়। এয়ার কমোডর সাত্তার আলভি সিরিয়ার পক্ষ থেকে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন।
স্বল্প খরচে দক্ষ পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা ছিল একটি কার্যকর কৌশল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকেই আরবরা বুঝেছিল যে অনিয়মিত বাহিনীও বড় শক্তিকে দুর্বল করতে পারে।
প্রভীন স্বামী দ্য প্রিন্ট-এর অবদানকারী সম্পাদক।
প্রভীন স্বামী 

















